ওডিশার ধেনকানাল জেলার পারজং থানা এলাকায় এক খ্রিস্টান যাজকের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে রাজ্যজুড়ে। ঘটনার আঠারো দিন পর যাজকের স্ত্রীর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার ওডিশা পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, চার জানুয়ারির এই ঘটনার বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারে যাজকের স্ত্রীর লিখিত অভিযোগের পরেই। অভিযোগে বলা হয়েছে, যাজক বিপিন নায়েককে একটি দল আক্রমণ করে, তাঁর গায়ে সিঁদুর লাগিয়ে দেওয়া হয়, জুতোর মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে ঘোরানো হয় এবং ধর্মান্তরের অভিযোগ তুলে তাঁকে একটি মন্দিরের সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, হামলাকারীরা বজরং দলের সঙ্গে যুক্ত।
ধেনকানালের পুলিশ সুপার অভিনব সোনকর জানান, এই অভিযোগগুলোর তদন্ত চলছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যাজককে নর্দমার পানি খাওয়ানো বা গোবর খাওয়ানোর মতো অভিযোগের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং এগুলো অভিযোগপত্রে উল্লেখ নেই।
গত উনিশ মাসে ওডিশার অন্তত ছয়টি শহরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার জেরে কারফিউ ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ওপর গণপিটুনির ঘটনাও। প্রশাসনের একটি অংশ স্বীকার করছে, অনেক ঘটনা হয়তো প্রকাশ্যে আসেনি, কারণ ভুক্তভোগীদের বড় অংশই দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক, যারা পুলিশের কাছে যেতে ভয় পান।
এই পরিস্থিতিকে বিরোধীরা ‘জঙ্গলরাজ’ আখ্যা দিয়ে রাজ্যের শাসন ব্যবস্থাকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছে। তাদের অভিযোগ, জুন দুই হাজার চব্বিশে বিজেপি প্রথমবার এককভাবে সরকার গঠনের পর থেকেই রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ছে।
চলতি বছরের চৌদ্দ জানুয়ারি বালাসোর জেলায় এক মুসলিম যুবককে গরু রক্ষার নামে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এর কয়েক সপ্তাহ আগেই পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ থেকে আসা ত্রিশ বছর বয়সী যুবক জুয়েল শেখ সাম্বলপুরে মারধরের পর মারা যান। দুটি ঘটনাতেই শুরুতে পুলিশ ঘৃণা জনিত অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। পরে জুয়েল শেখের ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
/sambad-english/media/media_files/2026/01/16/sundargarh-group-clash-2026-01-16-11-25-38.jpeg)
বালাসোর ঘটনায় প্রথমে দায়ের হওয়া মামলায় হামলার কোনো উল্লেখ ছিল না। সেখানে শুধু একটি ভ্যানের চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং গরু জবাই সংক্রান্ত আইনে অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু পরে প্রকাশ্যে আসা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নিহত মাকান্দার মহম্মদকে মারধর করা হচ্ছে এবং তাঁকে জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিতে ও গরুকে মা বলে ডাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। নিহতের ভাইয়ের অভিযোগের পর হত্যা মামলা রুজু হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারদের মুক্তির দাবিতে নিজেদের গোরক্ষক দাবি করা একটি গোষ্ঠী পুলিশ সুপারের দপ্তরের সামনে অবস্থান বিক্ষোভও করে।
এই সব ঘটনার মধ্যেই পশ্চিম ওডিশার সুন্দরগড় শহরে গরুর মাংস নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে নতুন করে উত্তেজনা। অন্তত বারো জন আহত হন এবং প্রশাসন ইন্টারনেট বন্ধ করে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাধ্য হয়।
গত বছরের অক্টোবর মাসে কটকের মতো হাজার বছরের পুরনো শহরেও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জেরে প্রায় তিন দিন কারফিউ জারি ছিল। দুর্গাপূজার বিসর্জন ঘিরে শুরু হওয়া সংঘর্ষ পরে বড় আকার নেয়। সেই সময় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি শান্তির আবেদন জানিয়ে বলেন, কটক ঐতিহ্যগতভাবে সম্প্রীতির শহর হলেও কিছু দুষ্কৃতীর কারণে সাম্প্রতিক সময়ে শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে।
বিজু জনতা দলের রাজ্যসভার সাংসদ সুলতা দেও অভিযোগ করেছেন, রাজ্যে চরম আইনহীনতা চলছে এবং ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট একটি পরিবেশ এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ দিচ্ছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক রাজ্যের সম্প্রীতির ভাবমূর্তি রক্ষায় সরকার ও সব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
কংগ্রেস নেতা অমিয়া পাণ্ডবের দাবি, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এই ধরনের ঘটনাগুলো পরিকল্পিত এবং শাসক দলের মদতে সংগঠিত। অন্যদিকে ওডিশার খ্রিস্টান সংগঠনের নেতা পল্লব লিমা পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাকেই দায়ী করছেন। মুসলিম উন্নয়ন পরিষদের নেতা সৈয়দ বরকত আলী তানভীরের মতে, রাজ্যে পরিকল্পিতভাবে বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। এক প্রাক্তন শীর্ষ পুলিশ কর্তার অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতাদের উস্কানিমূলক বক্তব্যের ফলেই স্বঘোষিত রক্ষকরা আইন হাতে তুলে নিচ্ছে।
তবে বিজেপি বিধায়ক অশোক মহান্তি বিরোধীদের সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, গবাদি পশু পাচারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভই এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে এবং সরকার কিছুই করছে না, এই দাবি ভিত্তিহীন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















