এক সময় ইউনিয়ন মানেই ছিল কর্মীদের ঢাল। বর্ণবাদী গালিগালাজ, যৌন হয়রানি কিংবা কর্মক্ষেত্রে অপমানের বিরুদ্ধে প্রথম কণ্ঠস্বর ছিল তারাই। কিন্তু সেই পরিচিত চিত্র বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একাধিক ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, নার্সদের সুরক্ষা নয়, বরং পরিচয় রাজনীতির পক্ষেই দাঁড়িয়েছে প্রভাবশালী ইউনিয়ন ও কর্তৃপক্ষ।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ জেনিফার মেলে। বারো বছরের অভিজ্ঞ এই সিনিয়র নার্স দুই বছর আগে কর্মস্থলে এমন এক ঘটনার মুখোমুখি হন, যা যে কোনো কর্মজীবী নারীর জন্য ভয়াবহ। উচ্চ নিরাপত্তার পুরুষ কারাগার থেকে চিকিৎসার জন্য আনা এক দণ্ডিত শিশু নির্যাতনকারী রোগী তাকে বারবার বর্ণবাদী ভাষায় গালিগালাজ করে। রোগীর সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি শান্ত থাকলেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
বিশ্বাসের জায়গা থেকে তিনি রোগীর পছন্দের নাম ব্যবহার করতে রাজি হলেও নারী সর্বনাম ব্যবহার করতে অস্বীকার করেন। এখানেই শুরু হয় বিপত্তি। সহানুভূতির বদলে কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে লিখিত সতর্কবার্তা দেয় এবং পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভিযোগ পাঠায়। পরে তিনি প্রকাশ্যে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বললে সাময়িক বরখাস্ত হন।
চলতি সপ্তাহে শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ জানায়, তার বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। কিন্তু এত কিছুর পরও আসেনি কোনো ক্ষমা, কোনো স্বীকারোক্তি। রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে একজন অভিজ্ঞ নার্সকে অযথা হেনস্তার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউনিয়নের নীরবতা ও নার্সদের হতাশা
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ইউনিয়নের ভূমিকা নিয়ে। ঐতিহ্যগতভাবে যারা কর্মীদের পক্ষে কথা বলত, সেই সংগঠনগুলোর কাছ থেকে জেনিফার মেলে কোনো কার্যকর সমর্থন পাননি। বরং তাকে আইনি ও নৈতিক লড়াইয়ে এগিয়ে আসতে হয়েছে ধর্মীয় সংগঠন ও ডানপন্থী রাজনীতিকদের সহায়তায়।

জেনিফারের ঘটনা একক নয়। ডার্লিংটনের নার্স বেথানি হাচিনসন ও লিসা লকি, এবং স্কটল্যান্ড এর ফাইফ এলাকার নার্স স্যান্ডি পেগিওন একই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। কর্মক্ষেত্রে নারী চেঞ্জিং রুমে নিজেকে নারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক পুরুষ সহকর্মীর প্রবেশের প্রতিবাদ জানিয়ে তারা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়েন।
ডার্লিংটনের মামলায় কর্মসংস্থান ট্রাইব্যুনাল সম্প্রতি রায় দিয়েছে, নারীদের সঙ্গে এভাবে চেঞ্জিং রুম ভাগ করতে বাধ্য করা তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে এবং শত্রুতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে। তবু অভিযোগকারী নারীরা ইউনিয়নের কাছ থেকে সমর্থনের বদলে প্রত্যাখ্যানই পেয়েছেন।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
আইন স্পষ্টভাবে বলে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের চেঞ্জিং রুমে পুরুষের প্রবেশের কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নেই এবং ভুল সর্বনাম ব্যবহারের অভিযোগ আইনত অপরাধ নয়। সর্বোচ্চ আদালত এই বিষয়টি আগেই নিশ্চিত করেছে। সমতা ও মানবাধিকার কমিশনও সংশোধিত নির্দেশনা দিয়েছে। তবু প্রশাসনিক স্তরে সেই নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে না।
সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এখানে মূল বাধা। যেসব ইউনিয়ন ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি বলে দাবি করে, তারা এই ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই
একজন নার্সকে বর্ণবাদী নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও ন্যূনতম সমর্থন না দেওয়া কি স্বাভাবিক হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে নারীর গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি কি এতটাই বিতর্কিত। সমালোচকদের মতে, যখন নারীদের সুরক্ষা দিতে এগিয়ে আসছে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী, আর শ্রম আন্দোলন নীরব দর্শক হয়ে থাকে, তখন সেই আন্দোলনের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















