যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের পার্ক সিটি—শীতের এই ছোট পাহাড়ি শহরটি প্রতিবছর জানুয়ারিতে বদলে যায় স্বাধীন সিনেমার মিলনমেলায়। ল্যাম্পপোস্টে উৎসবের ব্যানার, প্রধান সড়কজুড়ে আলো, আর চারপাশে অপেক্ষার উত্তেজনা। চার দশকের বেশি সময় ধরে সানড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসব এখান থেকেই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু এবছর সেই ইতিহাসে যুক্ত হলো এক আবেগী বিদায়। উটাহতে এটিই সানড্যান্সের শেষ আসর। আগামী বছর থেকে উৎসবের ঠিকানা বদলে যাচ্ছে কলোরাডোর বোল্ডারে।
হলিউড সংকটে স্বাধীন সিনেমা
সানড্যান্সের এই বিদায়ের পেছনে আছে সময়ের বাস্তবতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হলিউডে একের পর এক ধাক্কা লেগেছে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের উত্থান, অতিমারি, শ্রমিক আন্দোলন এবং বড় করপোরেট একীভূকরণ—সব মিলিয়ে স্বাধীন সিনেমার জন্য বাজার সংকুচিত হয়েছে। আগে যে উৎসবে সিনেমা কিনতে হুড়োহুড়ি ছিল, এখন সেখানে বিনিয়োগকারীরা অনেক বেশি সতর্ক। নির্মাতাদের ভাষায়, কনটেন্ট কেনার সেই স্বর্ণযুগ আর নেই।

রবার্ট রেডফোর্ড ছাড়া প্রথম সানড্যান্স
এবছরের উৎসব আরেকটি কারণে স্মরণীয়। সানড্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট রেডফোর্ডকে ছাড়া এটিই প্রথম আয়োজন। গত বছরের শেষদিকে তার মৃত্যু স্বাধীন সিনেমা অঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। মূলধারার ঝলকানির বিপরীতে স্বাধীন নির্মাতাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলাই ছিল তার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছিল সানড্যান্স ইনস্টিটিউট ও উৎসব।
যেখানে জন্ম নেয় নতুন নির্মাতা
দীর্ঘদিন ধরে সানড্যান্স ছিল নতুন চিত্রনাট্যকার ও পরিচালকদের উত্থানের মঞ্চ। এখান থেকেই শুরু করেছিলেন অনেক নামকরা নির্মাতা। চলতি পুরস্কার মৌসুমেও তার প্রমাণ মিলছে। আলোচিত কয়েকজন পরিচালকের প্রথম বড় পরিচিতি এসেছিল এই উৎসবেই। কম বাজেটের একটি ভয়ধর্মী ছবি একসময় এখান থেকে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল, যা দেখিয়ে দিয়েছিল স্বাধীন সিনেমাও বাণিজ্যিকভাবে ইতিহাস গড়তে পারে।

বোল্ডারে যাত্রা কেন
সানড্যান্সের ঠিকানা বদল আসলে চলচ্চিত্র শিল্পের ভূগোল বদলের ইঙ্গিত। শুটিং লোকেশন নির্ধারণে এখন কর ছাড় বড় বিষয়। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ইউরোপ ও কানাডায় কাজ সরেছিল বহু আগেই। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকায় শুটিংয়ের দিন ক্রমেই কমছে। এই বাস্তবতায় কলোরাডো বড় অঙ্কের কর ছাড় দিয়ে সানড্যান্সকে আকর্ষণ করেছে।
পার্ক সিটি থেকে বড় বাস্তবতায়
পার্ক সিটির সীমাবদ্ধতাও কম নয়। উৎসব চলাকালে হোটেলের ভাড়া এতটাই বেড়ে যায় যে অনেক নির্মাতার পক্ষেই সেখানে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। শহরটি মূলত রিসোর্টনির্ভর, সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য নয়। অন্যদিকে বোল্ডার বড় শহর, যাতায়াত সহজ, তবু পাহাড়ি আবহ বজায় আছে। তাই আয়োজকদের মতে, উৎসবটি পার্ক সিটিকে ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই।

নতুন অর্থায়নের খোঁজ
নতুন শহরে সানড্যান্সের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। যখন বড় স্টুডিওগুলো শুধু সিক্যুয়েল আর পুনর্নির্মাণে ব্যস্ত, তখন স্বাধীন সিনেমাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন ভিন্ন পথ। করপোরেট সহায়তা, ব্যক্তিগত অনুদান, এমনকি উৎসবের নিজস্ব পণ্য বিক্রির কথাও ভাবছেন আয়োজকেরা। লক্ষ্য একটাই—স্বাধীন নির্মাতাদের জন্য জায়গা ধরে রাখা।
শেষ কথায় রেডফোর্ড
এই পরিবর্তনের ভেতর নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য রবার্ট রেডফোর্ডের একটি উপদেশ এখনো অনুপ্রেরণা জোগায়। তার মতে, গল্প বলার পথে আগে চাই রসবোধ, তারপর দক্ষতা, বুদ্ধিদীপ্ততা আর আকর্ষণ। সানড্যান্সের নতুন অধ্যায়েও হয়তো সেই দর্শনই পথ দেখাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















