০৬:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
পান্ডার ঘরে ফেরা ফিলাডেলফিয়ার রকি মূর্তি সরানো নয়, শহরের জনপরিসর রক্ষার প্রশ্ন ভ্যালেন্তিনোর বিদায়: ফ্যাশনের ঊর্ধ্বে উঠে যিনি গড়েছিলেন চিরন্তন সৌন্দর্যের সাম্রাজ্য দ্রুত ডেলিভারির আড়ালে মানবিক মূল্য রূপচর্চার উত্থান বদলে দিচ্ছে বিশ্ববাজারের মুখ শিক্ষা জীবনে অর্থ যোগ করুক ডেরা ইসমাইল খানে বিয়ের আসরে আত্মঘাতী হামলা, প্রাণ গেল সাতজনের বয়কট গুঞ্জনের মধ্যেই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করল পাকিস্তান চরম তাপের নাটক পেরিয়ে সিনারের প্রত্যাবর্তন, জোকোভিচের চারশো জয়ের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় বাংলাদেশের বদলে স্কটল্যান্ড, আইসিসির সিদ্ধান্তে ক্ষোভ আফ্রিদি ও গিলেস্পির

ফিলাডেলফিয়ার রকি মূর্তি সরানো নয়, শহরের জনপরিসর রক্ষার প্রশ্ন

ফিলাডেলফিয়ার শিল্প জাদুঘরের সিঁড়ির নিচে থাকা রকি মূর্তিকে ওপরে তোলার সিদ্ধান্তকে প্রশাসন এক ধরনের বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের ভাষায়, এটি দুর্বল পক্ষের জয়। কিন্তু শহরের সাধারণ মানুষের চোখে বিষয়টি ভিন্ন। এই সিদ্ধান্ত আসলে ফিলাডেলফিয়ার ঐতিহ্যবাহী জনপরিসরকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক দখলের আরও একটি অধ্যায় মাত্র।

শিল্প কমিশনের অনুমোদনের পর জাদুঘরের সিঁড়ির শীর্ষে রকি মূর্তিকে স্থায়ীভাবে বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, এতে পর্যটকদের জন্য দৃশ্য আরও আকর্ষণীয় হবে এবং রকি নামের ব্র্যান্ডের গুরুত্ব বাড়বে। তবে বাস্তবে এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শহরের বাসিন্দারা, যারা এত দিন ধরে এই উন্মুক্ত জায়গাগুলো নিজেদের বলে ভেবে এসেছেন।

জনপরিসরের ক্রমাগত বেসরকারিকরণ

ফিলাডেলফিয়া শিল্প জাদুঘরের আশপাশের এলাকা একসময় ছিল সব বয়সের মানুষের জন্য উন্মুক্ত হাঁটার জায়গা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে একের পর এক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা ঢুকে পড়েছে। জাদুঘরের পেছনে তাকালেই চোখে পড়ে সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ, ফেয়ারমাউন্ট ওয়াটার ওয়ার্কসে বড় আকারের ভোজসভা আয়োজন। একসময় যেখানে মানুষ নদীর দৃশ্য উপভোগ করতে আসত, সেখানে এখন স্থায়ীভাবে বসানো সার্ভার স্টেশন, অস্থায়ী শৌচাগার আর ঢাকা পথ।

যদিও অনুষ্ঠান না থাকলে দর্শনার্থীদের প্রবেশের অনুমতি থাকে, বাস্তবে কড়া ব্যারিকেড আর প্রস্তুতির দৃশ্য দেখে অনেকেই সেখানে যাওয়ার সাহস পান না। বিকেলের দিকেই সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় দিনের বড় একটি সময় সাধারণ মানুষের জন্য এই জায়গা কার্যত বন্ধই থাকে। বসন্ত এলেই নদীর ওপর কাচঘেরা বিশাল পার্টি হল বসানো হয়, যা শরৎ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরানো হয় না। ফলে বছরের উষ্ণ সময়গুলোতে এই সুন্দর জায়গা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকেই যায়।

Art Commission approves plan to move Rocky statue to top of Art Museum steps

রকি মূর্তির বর্তমান অবস্থান ই যথেষ্ট

রকি মূর্তির বর্তমান অবস্থান শিল্প জাদুঘরের সিঁড়ির নিচের ছায়াঘেরা জায়গায়। এই জায়গাটি বহু বছর ধরেই জনপ্রিয়। দুই হাজার ছয় সালে সেখানে স্থাপন হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষ এই মূর্তির সঙ্গে ছবি তুলতে আসেন, যা লিবার্টি মূর্তির দর্শনার্থীর সংখ্যার সমান। রাস্তার কাছেই হওয়ায় বাস বা গাড়ি থেকে নেমে সহজেই ছবি তোলা যায়। চলাচলে অসুবিধা নেই, উৎসবমুখর পরিবেশে স্থানীয় আর পর্যটকরা একসঙ্গে সময় কাটান।

এই অবস্থান এতটাই কার্যকর যে, সেটি পরিবর্তনের পক্ষে তেমন কোনো জনদাবিও ছিল না। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষ মূর্তিটিকে বর্তমান জায়গাতেই রাখতে চেয়েছেন, কেউ কেউ তো পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন।

নতুন অবস্থানে বাড়বে অসুবিধা

মূর্তিকে সিঁড়ির ওপরে তুললে চলাচলে সমস্যায় পড়বেন শারীরিকভাবে অক্ষম বা বয়স্ক দর্শনার্থীরা। তাদের জন্য বিশেষ পরিবহনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব এসেছে, যেখানে নিয়মিত বাস চলবে। এতে জায়গাটি আরও ভিড়পূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকর্তারা বলছেন, রকি একটি অনন্য পর্যটন আকর্ষণ এবং এটি নিয়ে বই, অনুষ্ঠান এমনকি বড় প্রদর্শনীর পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে শহরের সাধারণ মানুষের কী লাভ হচ্ছে, যখন তাদের পরিচিত উন্মুক্ত জায়গা আরও সীমিত হয়ে যাচ্ছে।

Plan to keep a Rocky statue at the top of the Art Museum steps in Philly moves forward

ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তের প্রশ্ন

মূর্তিটি সরিয়ে নতুন ভিত্তিতে বসাতে খরচ ধরা হয়েছিল প্রায় পনেরো লক্ষ টাকা সমপরিমাণ অর্থ। পরে সেই হিসাব বেড়ে পঁচিশ লক্ষে পৌঁছাতে পারে বলে জানানো হয়েছে। এর সঙ্গে পরিবহন চালানোর অতিরিক্ত ব্যয়ও রয়েছে। অথচ শহর যে পরিমাণ অর্থ বাণিজ্যিক ভাড়ার বিনিময়ে পাচ্ছে, তার তুলনায় এই ব্যয় নগণ্য নয়। একদিকে জনপরিসর বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে সীমিত আয়, অন্যদিকে প্রতীকী একটি মূর্তি সরাতে বিপুল খরচ—এই বৈপরীত্যই প্রশ্ন তুলছে নাগরিক সমাজে।

নাগরিক আপত্তি ও উদ্বেগ

শিল্প কমিশনের শুনানিতে খুব কম মানুষ কথা বললেও বেশ কয়েকটি নাগরিক সংগঠন লিখিতভাবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। তাদের বক্তব্য, এটি শুধু একটি মূর্তি সরানোর বিষয় নয়, বরং শহরের সংস্কৃতি ও জনপরিসরকে ধীরে ধীরে পণ্যে পরিণত করার প্রবণতার প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে, ফিলাডেলফিয়ার রকি মূর্তি সরানোর সিদ্ধান্ত আসলে শহরের ভবিষ্যৎ জনপরিসর কেমন হবে, সেই বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান জায়গায় যেখানে মূর্তিটি সবার জন্য সহজলভ্য ও প্রাণবন্ত, সেখানে অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন কি সত্যিই দরকার, সেটাই এখন মূল আলোচনার বিষয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

পান্ডার ঘরে ফেরা

ফিলাডেলফিয়ার রকি মূর্তি সরানো নয়, শহরের জনপরিসর রক্ষার প্রশ্ন

০৪:০০:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

ফিলাডেলফিয়ার শিল্প জাদুঘরের সিঁড়ির নিচে থাকা রকি মূর্তিকে ওপরে তোলার সিদ্ধান্তকে প্রশাসন এক ধরনের বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের ভাষায়, এটি দুর্বল পক্ষের জয়। কিন্তু শহরের সাধারণ মানুষের চোখে বিষয়টি ভিন্ন। এই সিদ্ধান্ত আসলে ফিলাডেলফিয়ার ঐতিহ্যবাহী জনপরিসরকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক দখলের আরও একটি অধ্যায় মাত্র।

শিল্প কমিশনের অনুমোদনের পর জাদুঘরের সিঁড়ির শীর্ষে রকি মূর্তিকে স্থায়ীভাবে বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, এতে পর্যটকদের জন্য দৃশ্য আরও আকর্ষণীয় হবে এবং রকি নামের ব্র্যান্ডের গুরুত্ব বাড়বে। তবে বাস্তবে এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শহরের বাসিন্দারা, যারা এত দিন ধরে এই উন্মুক্ত জায়গাগুলো নিজেদের বলে ভেবে এসেছেন।

জনপরিসরের ক্রমাগত বেসরকারিকরণ

ফিলাডেলফিয়া শিল্প জাদুঘরের আশপাশের এলাকা একসময় ছিল সব বয়সের মানুষের জন্য উন্মুক্ত হাঁটার জায়গা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে একের পর এক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা ঢুকে পড়েছে। জাদুঘরের পেছনে তাকালেই চোখে পড়ে সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ, ফেয়ারমাউন্ট ওয়াটার ওয়ার্কসে বড় আকারের ভোজসভা আয়োজন। একসময় যেখানে মানুষ নদীর দৃশ্য উপভোগ করতে আসত, সেখানে এখন স্থায়ীভাবে বসানো সার্ভার স্টেশন, অস্থায়ী শৌচাগার আর ঢাকা পথ।

যদিও অনুষ্ঠান না থাকলে দর্শনার্থীদের প্রবেশের অনুমতি থাকে, বাস্তবে কড়া ব্যারিকেড আর প্রস্তুতির দৃশ্য দেখে অনেকেই সেখানে যাওয়ার সাহস পান না। বিকেলের দিকেই সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় দিনের বড় একটি সময় সাধারণ মানুষের জন্য এই জায়গা কার্যত বন্ধই থাকে। বসন্ত এলেই নদীর ওপর কাচঘেরা বিশাল পার্টি হল বসানো হয়, যা শরৎ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরানো হয় না। ফলে বছরের উষ্ণ সময়গুলোতে এই সুন্দর জায়গা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকেই যায়।

Art Commission approves plan to move Rocky statue to top of Art Museum steps

রকি মূর্তির বর্তমান অবস্থান ই যথেষ্ট

রকি মূর্তির বর্তমান অবস্থান শিল্প জাদুঘরের সিঁড়ির নিচের ছায়াঘেরা জায়গায়। এই জায়গাটি বহু বছর ধরেই জনপ্রিয়। দুই হাজার ছয় সালে সেখানে স্থাপন হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষ এই মূর্তির সঙ্গে ছবি তুলতে আসেন, যা লিবার্টি মূর্তির দর্শনার্থীর সংখ্যার সমান। রাস্তার কাছেই হওয়ায় বাস বা গাড়ি থেকে নেমে সহজেই ছবি তোলা যায়। চলাচলে অসুবিধা নেই, উৎসবমুখর পরিবেশে স্থানীয় আর পর্যটকরা একসঙ্গে সময় কাটান।

এই অবস্থান এতটাই কার্যকর যে, সেটি পরিবর্তনের পক্ষে তেমন কোনো জনদাবিও ছিল না। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষ মূর্তিটিকে বর্তমান জায়গাতেই রাখতে চেয়েছেন, কেউ কেউ তো পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন।

নতুন অবস্থানে বাড়বে অসুবিধা

মূর্তিকে সিঁড়ির ওপরে তুললে চলাচলে সমস্যায় পড়বেন শারীরিকভাবে অক্ষম বা বয়স্ক দর্শনার্থীরা। তাদের জন্য বিশেষ পরিবহনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব এসেছে, যেখানে নিয়মিত বাস চলবে। এতে জায়গাটি আরও ভিড়পূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকর্তারা বলছেন, রকি একটি অনন্য পর্যটন আকর্ষণ এবং এটি নিয়ে বই, অনুষ্ঠান এমনকি বড় প্রদর্শনীর পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে শহরের সাধারণ মানুষের কী লাভ হচ্ছে, যখন তাদের পরিচিত উন্মুক্ত জায়গা আরও সীমিত হয়ে যাচ্ছে।

Plan to keep a Rocky statue at the top of the Art Museum steps in Philly moves forward

ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তের প্রশ্ন

মূর্তিটি সরিয়ে নতুন ভিত্তিতে বসাতে খরচ ধরা হয়েছিল প্রায় পনেরো লক্ষ টাকা সমপরিমাণ অর্থ। পরে সেই হিসাব বেড়ে পঁচিশ লক্ষে পৌঁছাতে পারে বলে জানানো হয়েছে। এর সঙ্গে পরিবহন চালানোর অতিরিক্ত ব্যয়ও রয়েছে। অথচ শহর যে পরিমাণ অর্থ বাণিজ্যিক ভাড়ার বিনিময়ে পাচ্ছে, তার তুলনায় এই ব্যয় নগণ্য নয়। একদিকে জনপরিসর বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে সীমিত আয়, অন্যদিকে প্রতীকী একটি মূর্তি সরাতে বিপুল খরচ—এই বৈপরীত্যই প্রশ্ন তুলছে নাগরিক সমাজে।

নাগরিক আপত্তি ও উদ্বেগ

শিল্প কমিশনের শুনানিতে খুব কম মানুষ কথা বললেও বেশ কয়েকটি নাগরিক সংগঠন লিখিতভাবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। তাদের বক্তব্য, এটি শুধু একটি মূর্তি সরানোর বিষয় নয়, বরং শহরের সংস্কৃতি ও জনপরিসরকে ধীরে ধীরে পণ্যে পরিণত করার প্রবণতার প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে, ফিলাডেলফিয়ার রকি মূর্তি সরানোর সিদ্ধান্ত আসলে শহরের ভবিষ্যৎ জনপরিসর কেমন হবে, সেই বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান জায়গায় যেখানে মূর্তিটি সবার জন্য সহজলভ্য ও প্রাণবন্ত, সেখানে অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন কি সত্যিই দরকার, সেটাই এখন মূল আলোচনার বিষয়।