বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের মন-মেজাজ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব একটা ভালো নেই। মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনিশ্চয়তা মানুষের আত্মবিশ্বাসে চাপ ফেলেছে। তবু আশ্চর্যভাবে মানুষ আগের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল দেখাতে আগ্রহী। বৈশ্বিক পরামর্শক সংস্থাগুলোর হিসাবে, দুই হাজার চব্বিশ সালে বিশ্বে রূপচর্চা পণ্যে খুচরা ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় চুয়াল্লিশ হাজার কোটি ডলার, যা আগের দুই বছরে প্রতিবছর গড়ে সাত শতাংশ হারে বেড়েছে। সামগ্রিক খুচরা বাজারের তুলনায় এই বৃদ্ধি অনেক দ্রুত।
চাপের সময়ে ছোটখাটো আনন্দে খরচ করার প্রবণতাকে অনেকেই ব্যাখ্যা করছেন পরিচিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব দিয়ে। তবে শুধু আবেগ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক পরিবর্তন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বক্ষণ চোখ রাখার ফলে মানুষ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে নিজের চেহারা নিয়ে সচেতন। তারকাদের ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহার কিংবা আধুনিক অস্ত্রোপচারের খবর সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে।
নারী থেকে পুরুষ, বয়সের সীমা ভাঙছে
একসময় রূপচর্চা শিল্পের প্রধান লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট বয়সী নারীরা। এখন সেই চিত্র বদলেছে। পুরুষরাও আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ করছেন রূপচর্চা পণ্যে। চুলের জেল বা মুখের ক্রিমে সীমাবদ্ধ না থেকে তাঁরা হালকা সাজের দিকেও ঝুঁকছেন। ত্বকের রং সমান করা ময়েশ্চারাইজার, দাগ ঢাকার সামগ্রী কিংবা ভ্রু ঠিক করার পণ্য ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। দোকানগুলোতেও এই পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে। অনেক বিক্রেতা পুরুষ কর্মী নিয়োগ করছেন, যাতে কাউন্টারগুলো কম ভীতিকর লাগে।

আরও উদ্বেগজনক দিক হলো অল্প বয়সীদের আগ্রহ। সামাজিক মাধ্যমে নানা পণ্যের প্রচার দেখে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই এসব ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যে বয়সে আগের প্রজন্ম রূপচর্চা শুরু করত, তার অনেক আগেই আজকের শিশুরা এই অভ্যাসে ঢুকে পড়ছে।
পণ্যের ভাষা বদল, বিজ্ঞানের ছোঁয়া
রূপচর্চা পণ্যের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ত্বক পরিচর্যা এখন মোট ব্যয়ের বড় অংশ দখল করছে। মানুষ উপাদানের কার্যকারিতা নিয়ে জানছে, কোন উপাদান বয়সের ছাপ কমাতে সাহায্য করে বা ত্বক ভালো রাখে, সে বিষয়ে আগ্রহ বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে চিকিৎসক পরিচয়ে নানা তথ্য ছড়াচ্ছে, সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে। এর ফলে সহজ, চিকিৎসাবিদ্যাভিত্তিক লেবেল দেওয়া পণ্য জনপ্রিয় হচ্ছে। বাহারি রঙের জার আর রোমান্টিক নামের জায়গা নিচ্ছে সাদামাটা বোতল।
এ ছাড়া ভেতর থেকে সৌন্দর্য বাড়ানোর ধারণাও জনপ্রিয় হচ্ছে। কোলাজেন বড়ি বা আলো ব্যবহারকারী মুখোশের মতো যন্ত্রের চাহিদা বাড়ছে। নারী-পুরুষ উভয়েই এখন সৌন্দর্যসেবার দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে এমন উপকরণ ব্যবহার হয় যা ঘরে বসে পাওয়া যায় না।
সৌন্দর্য আর চিকিৎসার সীমারেখা ঝাপসা
বোটক্স, ফিলার কিংবা রাসায়নিক পিলের মতো সেবায় খরচ বাড়ছে দ্রুত। আন্তর্জাতিক হিসাব বলছে, সাম্প্রতিক বছরে অস্ত্রোপচারবিহীন সৌন্দর্যপ্রক্রিয়ার সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে সৌন্দর্য আর চিকিৎসার মাঝের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হচ্ছে। অনেক ক্লিনিকে এখন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা আর চিকিৎসাভিত্তিক পরামর্শ একসঙ্গে মিলছে। লক্ষ্য শুধু বলিরেখা ঢেকে রাখা নয়, বরং সুস্থ দেখানো।
নতুন ব্র্যান্ড, বড়দের অধিগ্রহণ
এই পরিবর্তনের বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে নতুন ব্র্যান্ডগুলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে বড় জানালা। কম খরচে তারা তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সুগন্ধির ক্ষেত্রেও নতুন নাম আর নতুন ধারণা তরুণদের আকর্ষণ করছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব উদ্যোগকে হুমকি নয়, বরং সুযোগ হিসেবে দেখছে। তাই তারা জনপ্রিয় ছোট ব্র্যান্ড কিনে নিচ্ছে, যাতে বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করা যায়।
বড় প্রতিষ্ঠানের সুবিধা হলো তাদের পরিসর ও অর্থনৈতিক শক্তি। খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি, বড় প্রচারণা চালানো কিংবা নতুন বাজারে বিনিয়োগ করা তাদের জন্য সহজ। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজার ধরে রাখতে তারা এখন আরও সক্রিয়। তাদের আশা, নিখুঁত মুখের যে আদর্শ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তা যেন শিগগির ফুরিয়ে না যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
























