এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাণ খাত মানেই ছিল স্থায়ী আয়, সামাজিক মর্যাদা আর মধ্যবিত্ত জীবনের নিশ্চয়তা। সেই বাস্তবতা এখন অতীত। মজুরি কমে যাওয়া, কাজের পরিবেশের অবনতি আর চাকরির নিরাপত্তা হারানোর মধ্যেই তৈরি হয়েছে বড় শূন্যতা। সেই ফাঁক পূরণ করেছেন অভিবাসী শ্রমিকেরা। আজ যুক্তরাষ্ট্রের বাড়ি নির্মাণ ও সংস্কারের বড় অংশই দাঁড়িয়ে আছে তাঁদের শ্রমে।
শ্রমবাজারের বদলে যাওয়া চেহারা
সত্তর ও আশির দশকে নির্মাণ খাতে বিদেশে জন্ম নেওয়া শ্রমিকের অংশ অন্য খাতের মতোই ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র আমূল বদলে যায়। এখন নির্মাণ খাতে অভিবাসী শ্রমিকের অংশ অন্যান্য পেশার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিবর্তনের পেছনে প্রচলিত ধারণা হলো অভিবাসীরা নাকি আমেরিকানদের কাজ কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তথ্য আর ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। আগে কাজের মান ও মজুরি নেমেছে, পেশার আকর্ষণ কমেছে। তার পরেই সেই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে এসেছে অভিবাসীরা।
ইউনিয়নের পতন, মজুরির ধস
এক সময় ইউনিয়নভিত্তিক নির্মাণ কাজ কলেজ ডিগ্রি ছাড়াই ভালো জীবনের সুযোগ দিত। সত্তরের দশকে নির্মাণ খাতে প্রায় চল্লিশ শতাংশ শ্রমিক ইউনিয়নের আওতায় ছিলেন। পরে শ্রম আইন দুর্বল হওয়া, বড় কর্পোরেট লবির চাপ আর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ইউনিয়নের শক্তি ভেঙে পড়ে। ক্যালিফোর্নিয়াসহ নানা রাজ্যে ধর্মঘট ব্যর্থ হওয়ার পর অইউনিয়ন শ্রমিকদের প্রবেশ বেড়ে যায়। ফলাফল হিসেবে কাজের মজুরি কমে, সুবিধা হারায় শ্রমিকেরা। বাড়ির দাম কমেনি, কিন্তু শ্রমের মূল্য নেমে গেছে।
আজ ইউনিয়নভুক্ত নির্মাণ শ্রমিকের আয় গড় আমেরিকান শ্রমিকের তুলনায় সামান্য বেশি হলেও অইউনিয়ন শ্রমিকেরা গড় আয়ের চেয়েও কম পান, অনেক সময় স্বাস্থ্যসেবা বা অবসর সুবিধা ছাড়াই।

অভিবাসী শ্রমিকের বাস্তবতা
নব্বইয়ের দশকে মেক্সিকো থেকে আসা বহু তরুণ কঠিন শারীরিক পরিশ্রমের কাজ বেছে নেন, কারণ সেটিই ছিল টিকে থাকার উপায়। ছাদ মেরামত কিংবা নির্মাণকাজে নগদ মজুরি মিললেও নিরাপত্তা ছিল না। কেউ কেউ পরে বাড়ি কিনেছেন, নাগরিকত্ব পেয়েছেন। আবার অনেকেই এখনও ভাড়া বাসায়, অনিশ্চিত আইনি অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁদের অনেকেই বছরের পর বছর একই আয়ে আটকে আছেন।
কর্মী সংকট ও বাড়ির সংকট
আজ নির্মাণ খাতে প্রায় তিন লক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি। যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির ঘাটতি হিসাব অনুযায়ী পনেরো লক্ষ থেকে পঞ্চাশ লক্ষের মধ্যে। পর্যাপ্ত শ্রমিক না থাকলে নতুন বাড়ি নির্মাণ ধীর হবে, খরচ বাড়বে, বাড়ির দাম আরও চড়বে। গণহারে বহিষ্কার নীতি এই সংকট আরও গভীর করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নির্মাতারা।
কঠোর অভিবাসন নীতি এর সমর্থকেরা বলেন এতে আমেরিকানদের জন্য কাজ বাড়বে, মজুরি বাড়বে। কিন্তু গবেষণা বলছে উল্টো কথা। কাজের গতি কমে যায়, পুরো খাতেই চাকরি কমে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে বাড়ির ক্রেতা ও মালিকদের ওপর। ছাদের দাম এক বছরে যেভাবে বাড়ছে, তা ভবিষ্যতেও বাড়তেই থাকবে বলে আশঙ্কা।
নতুন প্রজন্ম কেন আসছে না
এক সময় শক্তিশালী ইউনিয়ন শিক্ষানবিশ কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন শ্রমিক তৈরি করত। এখন সেই সুযোগ প্রায় নেই। তরুণ আমেরিকানদের বড় অংশ কলেজে যাচ্ছে, সাদা কলারের পেশায় ঢুকছে। ডিগ্রি না থাকা তরুণদেরও অনেকেই নির্মাণ বা উৎপাদনের বদলে পরিষেবা খাতে কাজ বেছে নিচ্ছেন। ফলে নির্মাণ খাত ক্রমেই অভিবাসী শ্রমিক নির্ভর হয়ে পড়ছে।
এই বাস্তবতায় স্পষ্ট, নির্মাণ কাজের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও মজুরি ফিরিয়ে না আনলে শুধু নীতি বদলে সংকট কাটবে না। ঘর তৈরির ভবিষ্যৎ এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেই শ্রমিকদের কাঁধেই, যাঁরা প্রতিদিন রোদে পুড়ে, ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
























