১১:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
গাজীপুরে ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণে আহত ৩ সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রথমবারের মতো আরবি ক্যালিগ্রাফিতে লেখা হলো প্রথম কালেমা নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত ঈদযাত্রা নিশ্চিতে বক্তাদের জোর দাবি জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্যাংকারদের গণপরিবহন ব্যবহারের নির্দেশ দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান উপেক্ষা: আলোকসজ্জায় ঝলমলে ঢাকার শপিং মল জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর সংসদের আহ্বান জামায়াত আমিরের নারায়ণগঞ্জে বালুঘাটের দখল নিয়ে বিএনপির গ্রুপ সংঘর্ষ, আহত ১৫ ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি নাগরিক হওয়ার ঝুঁকি পোষা প্রাণীর জন্য ভিডিও এখন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়, স্ক্রিনে মজেছে বিড়াল-কুকুর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: সার-সংকটের শঙ্কায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুধার ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ

মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব কমালে সেই শূন্যতা পূরণ করছে কারা

প্রায় পাঁচ দশক আগে, ১৯৭৮ সালে, সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের (SJTU) প্রায় এক ডজন অধ্যাপক যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। তাদের লক্ষ্য ছিল মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কারখানার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। বলা হয়, সেই সময়ের চীনা নেতা দেং শিয়াওপিং নিজে এই সফরের অনুমোদন দিয়েছিলেন।

এই সফরের ফলেই কয়েকটি নামী মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে “সিস্টার-স্কুল” চুক্তি হয়, যার মধ্যে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল। সেই উদ্যোগই পরবর্তী কয়েক দশকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র একাডেমিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে SJTU ও মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে একটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে। এখানে যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক ও কম্পিউটার প্রকৌশলে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া হতো। দীর্ঘদিন এটিকে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার একটি আদর্শ মডেল হিসেবে দেখা হয়েছিল।

তবে ২০২৫ সালের শুরুতে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় হঠাৎ করেই এই অংশীদারিত্ব শেষ করে। অর্থায়ন, রাজনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এরপর SJTU সেই যৌথ ইনস্টিটিউটকে নতুন রূপ দিয়ে “SJTU গ্লোবাল কলেজ” হিসেবে পরিচালনা শুরু করে এবং নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদার খুঁজতে থাকে।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টি এ বছর “ঝাংজিয়াং ইন্টারন্যাশনাল কলেজ অব টেকনোলজি” প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে। এতে সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা থাকবে।

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব

SJTU-মিশিগান ইনস্টিটিউটের বন্ধ হয়ে যাওয়া একক কোনো ঘটনা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে একাধিক যৌথ শিক্ষা প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

জর্জিয়া টেক-শেনজেন ইনস্টিটিউট
ছিংহুয়া-বার্কলে শেনজেন ইনস্টিটিউট
সিচুয়ান ইউনিভার্সিটি-পিটসবার্গ ইনস্টিটিউট

এসব প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি ও সমালোচনার মুখে পড়েছিল।

এই ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে যে চীনে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার ধরনে বড় পরিবর্তন আসছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন একাডেমিক অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা ও সীমা দুটোকেই প্রভাবিত করছে।

মার্কিন রাজনীতির চাপ

চীনের সঙ্গে সহযোগিতায় যুক্ত মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের বাড়তি নজরদারির মুখে পড়েছে।

২০২৪ সালে মার্কিন কংগ্রেসের একটি কমিটি “CCP on the Quad” নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে ছয়টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তারা চীনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে সহায়তা করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন ফেডারেল তহবিল থেকে প্রাপ্ত গবেষণা দক্ষতা ব্যবহার করে এসব প্রতিষ্ঠান চীনের পারমাণবিক অস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত লেজার প্রযুক্তি, গ্রাফিন সেমিকন্ডাক্টর ও রোবোটিক্স উন্নয়নে সহায়তা করেছে।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের আরেকটি প্রতিবেদনে প্রায় ৫০টি চীন-যুক্তরাষ্ট্র একাডেমিক অংশীদারিত্ব বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়, যেগুলোকে “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” বলা হয়েছিল।

The US academic partnership with China, under strain for years, faces its  biggest threat | The Independent

যেসব প্রোগ্রাম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তার মধ্যে ছিল:

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি সাংহাই
জনস হপকিন্স ও ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ডক্টরেট প্রোগ্রাম
ছিংহুয়া ও টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ে মাস্টার্স
মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় ও সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ প্রোগ্রাম

নতুন অংশীদার খুঁজছে চীন

যখন কিছু মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে চীনের সঙ্গে যৌথ প্রকল্প থেকে সরে যাচ্ছে, তখন চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদার খুঁজছে।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চীনের আন্তর্জাতিক শিক্ষা অংশীদার এখন আরও বৈচিত্র্যময় হচ্ছে।

চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন অনুমোদিত আন্তর্জাতিক শিক্ষা অংশীদারিত্বের তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি এবং নিউজিল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতা গড়ে উঠছে।

২০২৫ সালে রেকর্ড সংখ্যক ২৮৫টি যৌথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রোগ্রাম অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে সক্রিয় চীন-বিদেশ শিক্ষা অংশীদারিত্বের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১,৫৮৯।

এই প্রোগ্রামগুলো চীনের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৭টিতে বিস্তৃত। বিশেষ করে তুলনামূলকভাবে কম উন্নত মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৈচিত্র্যময় অংশীদারিত্বের কৌশল

চীন-যুক্তরাষ্ট্র উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞ ডেনিস সাইমন মনে করেন, নতুন অনুমোদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে চীন সচেতনভাবে অংশীদারিত্ব বাড়াতে ও বৈচিত্র্যময় করতে চায়।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ও সীমাবদ্ধতার কারণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখানে অন্য দেশগুলো প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে চীনও একটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায়।

ওয়াশিংটনের পিটারসন ইনস্টিটিউটের গবেষক লি ঝুয়েন বলেন, চীন তার “জ্ঞান সরবরাহ ব্যবস্থা” বৈচিত্র্যময় করছে। যেমন দেশটি জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উৎস বৈচিত্র্যময় করছে, তেমনি জ্ঞান ও গবেষণা বিনিময়ের ক্ষেত্রেও একই কৌশল নিচ্ছে।

China and the US retreat from global primacy

STEM শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব

নতুন অংশীদারিত্বগুলোর একটি বড় অংশ STEM বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। STEM বলতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত বোঝায়।

চীনের শিক্ষা নীতিতে দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, কারণ এগুলো দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, STEM শিক্ষার চাহিদা এত বেশি যে যুক্তরাষ্ট্র সুযোগ কমালে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অন্য দেশের দিকে ঝুঁকবে।

চীনে যৌথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয়তা

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও চীনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌথ বিশ্ববিদ্যালয় বা যৌথ প্রোগ্রামের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

এগুলো বিদেশে পড়াশোনার তুলনায় কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দেয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী “দুই দুনিয়ার সেরা সুবিধা” পাচ্ছে—চীনের ভেতরে থেকেই আন্তর্জাতিক শিক্ষা।

উল্লেখযোগ্য যৌথ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে:

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি সাংহাই
ডিউক কুনশান ইউনিভার্সিটি
ওয়েনঝৌ-কিন ইউনিভার্সিটি
তিয়ানজিন জুলিয়ার্ড স্কুল (সংগীত শিক্ষা)
চাইনিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকং, শেনজেন
শেনজেন MSU-BIT ইউনিভার্সিটি

এসব প্রতিষ্ঠানে গবেষণা, আন্তর্জাতিক পাঠক্রম এবং ইংরেজি ভাষায় পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি

শানশি প্রদেশের এক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দং জিংইউ বলেন, তিনি বিদেশে ক্যারিয়ার গড়তে চান। তাই SJTU ও নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অংশীদারিত্ব তাকে আকর্ষণ করছে।

তার মতে, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা এবং চীনা ও পশ্চিমা শিক্ষার সমন্বয় তাকে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে সাহায্য করতে পারে।

সিচুয়ান প্রদেশের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ক্যাথি বলেন, SJTU-এর “০.৫+০.৫ মডেল” তার কাছে খুব আকর্ষণীয়।

এই ব্যবস্থায় বছরের অর্ধেক সময় সিঙ্গাপুরে এবং বাকি অর্ধেক সময় সাংহাইয়ে পড়াশোনা করা যায়। এতে বিদেশে পড়াশোনার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি স্থানীয় ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও থাকে।

তিনি আরও বলেন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন।

চীনা শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা

যুক্তরাষ্ট্র এখনো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য চীনের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।

একসময় এই সংখ্যা ছিল ৩৭২,০০০। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৭৭,০০০।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিছু চীনা শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, বিশেষ করে যারা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত বা উন্নত STEM বিষয়ে পড়াশোনা করছে।

যদিও পরে বাণিজ্য আলোচনার সময় এই অবস্থান কিছুটা নরম করা হয়।

চীনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষা অংশীদারিত্ব বাড়ানো চীনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এতে দেশটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারে এবং একাধিক দেশের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

এছাড়া বিভিন্ন দেশের শক্তিশালী শিক্ষাক্ষেত্র থেকে সুবিধা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়, যেমন:

জার্মানির প্রয়োগমূলক প্রকৌশল ব্যবস্থা
ব্রিটেনের গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা
দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নত উৎপাদন ও ইলেকট্রনিক্স প্রযুক্তি

নতুন ধরণের অংশীদারিত্ব

লি ঝুয়েন আরও বলেন, চীনের শিক্ষা সহযোগিতার ধরনেও পরিবর্তন আসছে।

আগে যেখানে শীর্ষ মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের নামী গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অংশীদারিত্ব হতো, এখন সেখানে প্রাদেশিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ছে।

এই ধরণের সহযোগিতা কম রাজনৈতিক নজরদারির মধ্যে থাকে এবং চীনের শিল্প ও উৎপাদন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে সহায়তা করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন এক ধরনের নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও এগিয়ে চলছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

গাজীপুরে ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণে আহত ৩

মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব কমালে সেই শূন্যতা পূরণ করছে কারা

০৭:০৪:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

প্রায় পাঁচ দশক আগে, ১৯৭৮ সালে, সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের (SJTU) প্রায় এক ডজন অধ্যাপক যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। তাদের লক্ষ্য ছিল মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কারখানার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। বলা হয়, সেই সময়ের চীনা নেতা দেং শিয়াওপিং নিজে এই সফরের অনুমোদন দিয়েছিলেন।

এই সফরের ফলেই কয়েকটি নামী মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে “সিস্টার-স্কুল” চুক্তি হয়, যার মধ্যে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল। সেই উদ্যোগই পরবর্তী কয়েক দশকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র একাডেমিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে SJTU ও মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে একটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে। এখানে যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক ও কম্পিউটার প্রকৌশলে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া হতো। দীর্ঘদিন এটিকে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার একটি আদর্শ মডেল হিসেবে দেখা হয়েছিল।

তবে ২০২৫ সালের শুরুতে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় হঠাৎ করেই এই অংশীদারিত্ব শেষ করে। অর্থায়ন, রাজনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এরপর SJTU সেই যৌথ ইনস্টিটিউটকে নতুন রূপ দিয়ে “SJTU গ্লোবাল কলেজ” হিসেবে পরিচালনা শুরু করে এবং নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদার খুঁজতে থাকে।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টি এ বছর “ঝাংজিয়াং ইন্টারন্যাশনাল কলেজ অব টেকনোলজি” প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে। এতে সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা থাকবে।

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব

SJTU-মিশিগান ইনস্টিটিউটের বন্ধ হয়ে যাওয়া একক কোনো ঘটনা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে একাধিক যৌথ শিক্ষা প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

জর্জিয়া টেক-শেনজেন ইনস্টিটিউট
ছিংহুয়া-বার্কলে শেনজেন ইনস্টিটিউট
সিচুয়ান ইউনিভার্সিটি-পিটসবার্গ ইনস্টিটিউট

এসব প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি ও সমালোচনার মুখে পড়েছিল।

এই ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে যে চীনে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার ধরনে বড় পরিবর্তন আসছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন একাডেমিক অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা ও সীমা দুটোকেই প্রভাবিত করছে।

মার্কিন রাজনীতির চাপ

চীনের সঙ্গে সহযোগিতায় যুক্ত মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের বাড়তি নজরদারির মুখে পড়েছে।

২০২৪ সালে মার্কিন কংগ্রেসের একটি কমিটি “CCP on the Quad” নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে ছয়টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তারা চীনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে সহায়তা করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন ফেডারেল তহবিল থেকে প্রাপ্ত গবেষণা দক্ষতা ব্যবহার করে এসব প্রতিষ্ঠান চীনের পারমাণবিক অস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত লেজার প্রযুক্তি, গ্রাফিন সেমিকন্ডাক্টর ও রোবোটিক্স উন্নয়নে সহায়তা করেছে।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের আরেকটি প্রতিবেদনে প্রায় ৫০টি চীন-যুক্তরাষ্ট্র একাডেমিক অংশীদারিত্ব বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়, যেগুলোকে “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” বলা হয়েছিল।

The US academic partnership with China, under strain for years, faces its  biggest threat | The Independent

যেসব প্রোগ্রাম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তার মধ্যে ছিল:

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি সাংহাই
জনস হপকিন্স ও ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ডক্টরেট প্রোগ্রাম
ছিংহুয়া ও টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ে মাস্টার্স
মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় ও সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ প্রোগ্রাম

নতুন অংশীদার খুঁজছে চীন

যখন কিছু মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে চীনের সঙ্গে যৌথ প্রকল্প থেকে সরে যাচ্ছে, তখন চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদার খুঁজছে।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চীনের আন্তর্জাতিক শিক্ষা অংশীদার এখন আরও বৈচিত্র্যময় হচ্ছে।

চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন অনুমোদিত আন্তর্জাতিক শিক্ষা অংশীদারিত্বের তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি এবং নিউজিল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতা গড়ে উঠছে।

২০২৫ সালে রেকর্ড সংখ্যক ২৮৫টি যৌথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রোগ্রাম অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে সক্রিয় চীন-বিদেশ শিক্ষা অংশীদারিত্বের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১,৫৮৯।

এই প্রোগ্রামগুলো চীনের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৭টিতে বিস্তৃত। বিশেষ করে তুলনামূলকভাবে কম উন্নত মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৈচিত্র্যময় অংশীদারিত্বের কৌশল

চীন-যুক্তরাষ্ট্র উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞ ডেনিস সাইমন মনে করেন, নতুন অনুমোদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে চীন সচেতনভাবে অংশীদারিত্ব বাড়াতে ও বৈচিত্র্যময় করতে চায়।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ও সীমাবদ্ধতার কারণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখানে অন্য দেশগুলো প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে চীনও একটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায়।

ওয়াশিংটনের পিটারসন ইনস্টিটিউটের গবেষক লি ঝুয়েন বলেন, চীন তার “জ্ঞান সরবরাহ ব্যবস্থা” বৈচিত্র্যময় করছে। যেমন দেশটি জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উৎস বৈচিত্র্যময় করছে, তেমনি জ্ঞান ও গবেষণা বিনিময়ের ক্ষেত্রেও একই কৌশল নিচ্ছে।

China and the US retreat from global primacy

STEM শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব

নতুন অংশীদারিত্বগুলোর একটি বড় অংশ STEM বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। STEM বলতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত বোঝায়।

চীনের শিক্ষা নীতিতে দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, কারণ এগুলো দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, STEM শিক্ষার চাহিদা এত বেশি যে যুক্তরাষ্ট্র সুযোগ কমালে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অন্য দেশের দিকে ঝুঁকবে।

চীনে যৌথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয়তা

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও চীনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌথ বিশ্ববিদ্যালয় বা যৌথ প্রোগ্রামের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

এগুলো বিদেশে পড়াশোনার তুলনায় কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দেয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী “দুই দুনিয়ার সেরা সুবিধা” পাচ্ছে—চীনের ভেতরে থেকেই আন্তর্জাতিক শিক্ষা।

উল্লেখযোগ্য যৌথ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে:

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি সাংহাই
ডিউক কুনশান ইউনিভার্সিটি
ওয়েনঝৌ-কিন ইউনিভার্সিটি
তিয়ানজিন জুলিয়ার্ড স্কুল (সংগীত শিক্ষা)
চাইনিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকং, শেনজেন
শেনজেন MSU-BIT ইউনিভার্সিটি

এসব প্রতিষ্ঠানে গবেষণা, আন্তর্জাতিক পাঠক্রম এবং ইংরেজি ভাষায় পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি

শানশি প্রদেশের এক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দং জিংইউ বলেন, তিনি বিদেশে ক্যারিয়ার গড়তে চান। তাই SJTU ও নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অংশীদারিত্ব তাকে আকর্ষণ করছে।

তার মতে, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা এবং চীনা ও পশ্চিমা শিক্ষার সমন্বয় তাকে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে সাহায্য করতে পারে।

সিচুয়ান প্রদেশের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ক্যাথি বলেন, SJTU-এর “০.৫+০.৫ মডেল” তার কাছে খুব আকর্ষণীয়।

এই ব্যবস্থায় বছরের অর্ধেক সময় সিঙ্গাপুরে এবং বাকি অর্ধেক সময় সাংহাইয়ে পড়াশোনা করা যায়। এতে বিদেশে পড়াশোনার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি স্থানীয় ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও থাকে।

তিনি আরও বলেন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন।

চীনা শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা

যুক্তরাষ্ট্র এখনো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য চীনের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।

একসময় এই সংখ্যা ছিল ৩৭২,০০০। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৭৭,০০০।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিছু চীনা শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, বিশেষ করে যারা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত বা উন্নত STEM বিষয়ে পড়াশোনা করছে।

যদিও পরে বাণিজ্য আলোচনার সময় এই অবস্থান কিছুটা নরম করা হয়।

চীনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষা অংশীদারিত্ব বাড়ানো চীনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এতে দেশটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারে এবং একাধিক দেশের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

এছাড়া বিভিন্ন দেশের শক্তিশালী শিক্ষাক্ষেত্র থেকে সুবিধা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়, যেমন:

জার্মানির প্রয়োগমূলক প্রকৌশল ব্যবস্থা
ব্রিটেনের গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা
দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নত উৎপাদন ও ইলেকট্রনিক্স প্রযুক্তি

নতুন ধরণের অংশীদারিত্ব

লি ঝুয়েন আরও বলেন, চীনের শিক্ষা সহযোগিতার ধরনেও পরিবর্তন আসছে।

আগে যেখানে শীর্ষ মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের নামী গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অংশীদারিত্ব হতো, এখন সেখানে প্রাদেশিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ছে।

এই ধরণের সহযোগিতা কম রাজনৈতিক নজরদারির মধ্যে থাকে এবং চীনের শিল্প ও উৎপাদন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে সহায়তা করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন এক ধরনের নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও এগিয়ে চলছে।