টোকিওর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ব্যস্ত কেনাকাটা ও বিনোদনকেন্দ্র উয়েনো। এই এলাকার পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দৈত্যাকার পান্ডা। বিস্কুট, কেক, খেলনা, ভাস্কর্য—সবখানেই পান্ডার উপস্থিতি। সেই উয়েনোই এখন শূন্যতার মুখে। মাসের শেষে উয়েনো চিড়িয়াখানার যমজ পান্ডা শিয়াও শিয়াও ও লেই লেই চীনে ফিরে যাচ্ছে। জাপানে থাকা শেষ দুই পান্ডার বিদায় শুধু আবেগের নয়, বড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবও ফেলতে যাচ্ছে।
উয়েনো ও পান্ডা: অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
উয়েনোতে পান্ডা শুধু একটি প্রাণী নয়, পুরো এলাকার প্রতীক। ১৯৭২ সালে প্রথম পান্ডা আসার পর থেকে উয়েনো চিড়িয়াখানায় মোট ১৫টি দৈত্যাকার পান্ডা থেকেছে। প্রতিটি জন্ম, বিশেষ করে ২০২১ সালের ২৩ জুন শিয়াও শিয়াও ও লেই লেইয়ের জন্ম, এলাকাজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। চিড়িয়াখানার সীমানা ছাড়িয়ে সেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে দোকান, ক্যাফে ও রাস্তায়।
বিদায়ের খবরে হতাশা
ঘোষণা আসার পরই হতাশার ঢেউ নামে। কারণ এই দুই যমজই জাপানে থাকা শেষ পান্ডা। এর আগে ২০২৫ সালে ওয়াকায়ামার অ্যাডভেঞ্চার ওয়ার্ল্ড থেকে একটি পান্ডা পরিবার চীনে ফিরে গেছে। শিয়াও শিয়াও ও লেই লেই বিদায় নিলে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর জাপানে একটিও দৈত্যাকার পান্ডা থাকবে না।
অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
উয়েনোর স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত। কানসাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এমেরিটাস কাটসুহিরো মিয়ামোতোর হিসাবে, উয়েনো চিড়িয়াখানা থেকে পান্ডা হারালে বছরে অন্তত ১৫৪০ কোটি ইয়েন অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। এই প্রভাব শুধু চিড়িয়াখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; হোটেল, সরাইখানা, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও স্যুভেনির দোকান—সবখানেই পড়বে ধাক্কা। কয়েক বছর এই অবস্থা চললে ক্ষতির অঙ্ক কয়েক হাজার কোটি ইয়েনে পৌঁছাতে পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতা ভয় বাড়াচ্ছে
২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে পান্ডা লিং লিং মারা যাওয়ার পর উয়েনো চিড়িয়াখানা পান্ডাশূন্য হয়েছিল। সেই অর্থবছরে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছয় দশকের মধ্যে প্রথমবার ৩০ লাখের নিচে নেমে আসে। সেই অভিজ্ঞতা আজও স্থানীয়দের মনে তাজা।
![]()
স্থানীয়দের লড়াই ও পান্ডা ফেরার গল্প
উয়েনোর প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো দোকান নিকি নো কাশির সঙ্গে পান্ডার ইতিহাস গভীরভাবে জড়িত। দোকানের প্রতিষ্ঠাতার ছেলে ও উয়েনো পর্যটন সংস্থার সম্মানসূচক চেয়ারম্যান তাদাও ফুতাতসুগি বহু বছর ধরে পান্ডার পক্ষে কাজ করছেন। তাঁর মতে, পান্ডা কোনো সাময়িক আকর্ষণ নয়, বরং উয়েনোর অবকাঠামোর অংশ।
২০০৯ সালে পান্ডা ফেরাতে তৎকালীন টোকিও গভর্নরের কাছে আবেদন করা হলেও উচ্চ ব্যয়ের কারণে সাড়া মেলেনি। পরে স্থানীয় স্কুলশিক্ষার্থীদের আঁকা ছবি ও হাতে লেখা চিঠি নিয়ে সিটি হলে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে রি রি ও শিন শিন উয়েনোতে আসে, যারা পরে শিয়াও শিয়াও ও লেই লেইয়ের জন্ম দেয়।
কূটনীতি ও ‘পান্ডা শক্তি’
পান্ডা শুধু জনপ্রিয় প্রাণী নয়, চীনের নরম কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। চীনে জন্মানো এই প্রাণীর বিদেশে উপস্থিতি সাধারণত সুসম্পর্কের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। জাপানের প্রধান মন্ত্রিসভার সচিব মিনোরু কিহারা বলেছেন, অতীতে পান্ডা বিনিময় জাপান-চীন জনগণের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
তবে তাইওয়ান ইস্যুতে জাপানের সাম্প্রতিক অবস্থানের কারণে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পান্ডা প্রত্যাবর্তনকে কেউ কেউ কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন।
ইতিহাসে পান্ডা কূটনীতির পথচলা
পশ্চিমা বিশ্বে পান্ডা পরিচিত হয় উনিশ শতকের শেষভাগে। পরে বিশ শতকে এসে এটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে চীন পান্ডাকে বন্ধুত্ব ও সদিচ্ছার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সময় পান্ডা উপহার বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। একই বছর জাপানেও পান্ডা আসে, যা দুই দেশের সম্পর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে সংরক্ষণ চুক্তির আওতায় পান্ডা উপহার নয়, বরং প্রজনন ঋণের ভিত্তিতে পাঠানো শুরু হয়। এতে কূটনীতির সঙ্গে সংরক্ষণও যুক্ত হয়।

বিদায়ের কাউন্টডাউন
জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই উয়েনো চিড়িয়াখানায় ভিড় বাড়ছে। শেষবারের মতো পান্ডা দেখার জন্য আগাম লটারির মাধ্যমে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। একসময় অপেক্ষার সময় ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। চিড়িয়াখানার কিউরেটর হিতোশি সুজুকির মতে, পান্ডা বিবর্তনের এক বিস্ময়। ভালুক হয়েও এরা প্রায় পুরোপুরি বাঁশের ওপর নির্ভরশীল।
প্রাপ্তবয়স্ক পান্ডাকে প্রতিদিন শরীরের ওজনের প্রায় ১৫ শতাংশ খাবার খেতে হয়। তাই তারা বেশিরভাগ সময় খাওয়া আর ঘুমের মধ্যেই কাটায়। এই শান্ত স্বভাবই তাদের জনপ্রিয়তার বড় কারণ।
যমজ লালনের বিরল অভিজ্ঞতা
শিয়াও শিয়াও ও লেই লেই ছিল উয়েনোর প্রথম যমজ পান্ডা। সাধারণত পান্ডা মা যমজ হলে একটি শাবকই লালন করে। এখানে মা শিন শিন ও তত্ত্বাবধায়করা পালা করে দুটি শাবকের যত্ন নিয়েছেন। তাও আবার করোনাভাইরাস মহামারির মাঝখানে, যখন বিদেশি বিশেষজ্ঞ আনা সম্ভব ছিল না। চীনের সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই লালন-পালন সম্পন্ন হয়।
ফেরার সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ
এই আবেগঘন বিদায়ের পেছনে কূটনৈতিক চুক্তিই মূল কারণ। টোকিও মহানগর সরকার ও চায়না ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন অ্যাসোসিয়েশনের চুক্তি অনুযায়ী যমজদের ফেরার সময়সূচি আগেই নির্ধারিত ছিল। তারা চলে গেলে বিশেষভাবে তৈরি খাঁচাগুলো আপাতত খালি থাকবে। অন্য প্রাণীর জন্য তা সহজে ব্যবহারযোগ্য নয়।
উয়েনোর মানুষ অপেক্ষায় আছে আবার সেই দিনটির, যখন সম্পর্কের বরফ গলবে এবং পান্ডা ফিরবে। কারণ পান্ডা ছাড়া উয়েনো, উয়েনোর মানুষের কাছে কল্পনাই করা যায় না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















