মধ্যবয়স মানেই কি নীরব অবসান, লজ্জা আর অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। সোনোরা ঝার উপন্যাস ‘ইনটেম্পারেন্স’ সেই কারণে প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। পঞ্চান্ন বছরে দাঁড়িয়ে এক ভারতীয় সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপিকা ঘোষণা করেন, তিনি স্বয়ম্বর করবেন। স্থান সিয়াটল। উদ্দেশ্য বিয়ে নয় শুধু, নিজের ইচ্ছা, দেহ, আকাঙ্ক্ষা আর ক্ষমতার প্রকাশ্য পুনর্দখল।
মধ্যবয়সের নতুন আখ্যান
এই উপন্যাস মধ্যবয়সকে করুণ স্মৃতি বা চিকিৎসার সমস্যা হিসেবে দেখায় না। বরং এটিকে বিদ্রোহ, খেলাচ্ছল আর সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরে। নায়িকার সিদ্ধান্ত কোনও হতাশা থেকে নয়, বরং কর্তৃত্বের স্পষ্ট ঘোষণা। তিনি নিয়ম ঠিক করবেন, মঞ্চ সাজাবেন, পুরুষদের পারফরম্যান্স দেখবেন এবং সমাজের চোখের সামনে প্রশ্ন তুলবেন—নারীর ইচ্ছার কি মেয়াদ ফুরিয়ে যায়।
নামহীন নায়িকা, সর্বজনীন অভিজ্ঞতা
উপন্যাসের নায়িকার কোনো নাম নেই। এই নামহীনতাই তাকে আরও কাছের করে তোলে। তিনি একাধারে নির্দিষ্ট একজন ভারতীয় নারী, আবার একই সঙ্গে অসংখ্য নারীর প্রতিনিধি। দু’বার বিচ্ছেদ, শৈশবের পোলিও জনিত প্রতিবন্ধকতা, পুরনো ক্ষত আর দেহগত আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু মিলেই তিনি সম্পূর্ণ। নাম না থাকায় পাঠক তাকে কোনও গণ্ডিতে আটকে রাখতে পারেন না।

স্বয়ম্বর যেন সামাজিক পরীক্ষা
উপন্যাসের শেষ ভাগে আসা স্বয়ম্বর কোনও রোমান্টিক চূড়ান্ত মুহূর্ত নয়। এটি এক সামাজিক পরীক্ষা। এখানে জাত, পুরুষত্ব, মাতৃত্ব, প্রতিবন্ধকতা আর ক্ষমতার সম্পর্ক উঠে আসে হাস্যরসের ভেতর দিয়েই। এই হাসি তুচ্ছ করে না, বরং প্রশ্নগুলোকে আরও ধারালো করে তোলে।
মেনোপজ আর নারীর দেহ রাজনীতি
এই উপন্যাসের অন্যতম সাহসী দিক মেনোপজকে গল্পের কেন্দ্রে আনা। হট ফ্ল্যাশ, সামাজিক অদৃশ্যতা আর অদ্ভুত এক মুক্তি—সব মিলিয়ে মেনোপজ এখানে রসিকতার বিষয় নয়, বরং প্লট। সমাজ যেখানে মধ্যবয়সী নারীর যৌন জীবনকে শেষ অধ্যায় ধরে নেয়, সেখানে এই উপন্যাস প্রকাশ্য প্রতিবাদ।
সিয়াটল, আধুনিক আশ্রয়
সিয়াটলের হাউসবোট, বইয়ের দোকান আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ উপন্যাসে এক আধুনিক আশ্রয় তৈরি করে। এখানে প্রাচীন আচার নতুন অর্থ পায়। একজন নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন আর রোমান্টিক আকাঙ্ক্ষা পরস্পরের বিরোধী নয়, বরং সহাবস্থানে থাকতে পারে।
![]()
লেখক ও চরিত্রের মিল
সোনোরা ঝা নিজেও সিয়াটলে কর্মরত এক শিক্ষাবিদ। একাধিক বিবাহ, একাডেমিক জীবন আর সাহিত্যচর্চা—এই মিল উপন্যাসকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তবে এটি আত্মজীবনী নয়, বরং মানবিক বৈপরীত্যের প্রতি লেখকের গভীর আকর্ষণের ফল।
একটি নীরব বিপ্লব
শেষ পর্যন্ত ‘ইনটেম্পারেন্স’ নির্বাচনের সামাজিক নাটক নিয়ে এক চিন্তাশীল অনুসন্ধান। নাম না দিয়ে নায়িকাকে মুছে ফেলা হয়নি, বরং মুক্ত করা হয়েছে। পাঠক তার সঙ্গে তর্ক করতে পারেন, তার সঙ্গে ইচ্ছা অনুভব করতে পারেন। এটি এক নীরব বিপ্লব, যেখানে মধ্যবয়সী নারী দৃশ্যমান হতে চান, চাইতে চান এবং বিদ্রোহকেই উৎসবে পরিণত করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















