দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে পঞ্চাশ বছর বয়সী এক রোগী জ্বর, মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া ও বিভ্রান্তি নিয়ে ভর্তি হলে চিকিৎসকেরা প্রথমেই মেনিনজাইটিসের আশঙ্কা করেন। দ্রুত পরীক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করা হয় এটি ভাইরাসজনিত না ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হলেও পরীক্ষায় নিশ্চিত হয় ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ। এরপর অ্যান্টিবায়োটিক বদলানো হয়। কিন্তু আরও গভীর পরীক্ষায় দেখা যায়, জীবাণুটি পেনিসিলিনের মতো শক্তিশালী ও বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ওই রোগী আগে কখনো হাসপাতালে ভর্তি হননি। এই ঘটনাই নতুন করে সামনে এনে দেয় ভারতের চিকিৎসকদের বড় উদ্বেগ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর ভয়াবহ বাস্তবতা।
বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে এই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। ধারণা করা হচ্ছে, দুই হাজার পঞ্চাশ সালের মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণে বিশ্বে এক কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। ভারতে এই বোঝা আরও ভারী। দুই হাজার উনিশ সালেই প্রায় তিন লাখ মৃত্যুর সঙ্গে এর যোগ পাওয়া গেছে। তবু দেশটি এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারকারী। এই বাস্তবতায় দিল্লির এআইএমএসে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে। বর্তমানে এখানে প্রায় পনেরোটি গবেষণা প্রকল্প চলছে, যার লক্ষ্য জীবাণুর প্রতিরোধের ধরন বোঝা, দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয় এবং যুক্তিসংগত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
জাতীয় পর্যায়ে হুমকি ও এআইএমএসের দায়িত্ব
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে জাতীয় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার পর এআইএমএস দিল্লিকে সংক্রামক রোগ গবেষণা ও নির্ণয় কেন্দ্র হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। পাশাপাশি এটি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নজরদারি নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী কেন্দ্রের দায়িত্বও পালন করছে। এখানে মূল জোর দেওয়া হচ্ছে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা এবং কঠোর হাসপাতাল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টাইফয়েড সৃষ্টিকারী সালমোনেলা টাইফির ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধ ক্ষমতা উদ্বেগজনক। উত্তর ভারতে এই জীবাণু কীভাবে ছড়াচ্ছে, তা জানতে উন্নত জিনগত পরীক্ষা ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্ধভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ঝুঁকি
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বড় কারণ হলো নিশ্চিতভাবে জীবাণু শনাক্তের আগেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা। গুরুতর রোগীর ক্ষেত্রে এটি কখনো কখনো অনিবার্য হলেও সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন পরে জীবাণু শনাক্ত না হওয়ায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক চালু থাকে। এআইএমএসের গবেষণাগুলো এই অনিশ্চয়তার সময় কমাতে কাজ করছে, যাতে দ্রুত পরীক্ষা করে বিস্তৃত অ্যান্টিবায়োটিক থেকে নির্দিষ্ট চিকিৎসায় যাওয়া যায়।
সেপসিস প্রতিরোধে আগাম শনাক্তকরণ
সেপসিস এমন একটি প্রাণঘাতী অবস্থা, যেখানে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ায় অঙ্গ বিকল হতে পারে। দ্রুত শনাক্ত না হলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এআইএমএসে রক্তে ব্যাকটেরিয়া উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য বিশেষ বায়োমার্কার চিহ্নিত করার কাজ চলছে। দ্রুত বোঝা গেলে অ্যান্টিবায়োটিক দরকার কি না, অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি, অনেক সময় পরীক্ষায় জীবাণু ধরা না পড়লেও সংক্রমণ চলতে থাকে। এই ক্ষেত্রেও উন্নত শনাক্তকরণ পদ্ধতি তৈরির চেষ্টা চলছে।
জটিল সংক্রমণে উন্নত রোগ নির্ণয়
ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক জীবন বাঁচালেও পরে জীবাণু শনাক্তে সমস্যা হয়। তাই বায়োমার্কারভিত্তিক পরীক্ষা ও এমন ব্যাকটেরিয়া শনাক্তের উপায় খোঁজা হচ্ছে, যেগুলো জীবিত থাকলেও সাধারণ পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। একইভাবে ডায়রিয়ার ক্ষেত্রেও সব সংক্রমণ এক রকম নয়। ই কোলাইয়ের কিছু ধরন বিষ উৎপাদন করে বা অন্ত্রের ভেতরে আক্রমণ করে। সঠিক পরীক্ষা ছাড়া অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। এসব ভুল কমাতে আধুনিক আণবিক পরীক্ষা নিয়ে গবেষণা চলছে।
বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে উচ্চমাত্রায় প্রতিরোধী কিছু ব্যাকটেরিয়া, যেগুলো হাসপাতালে ও সমাজে দ্রুত ছড়াচ্ছে। এআইএমএসে ডিএনএ ও আরএনএ স্তরে এমন চিহ্ন খোঁজা হচ্ছে, যাতে দ্রুত বোঝা যায় কোন ওষুধ কার্যকর হবে। প্রস্রাবের সংক্রমণও এখন বড় সমস্যা হয়ে উঠছে, যেখানে উপসর্গ না থাকলেও ব্যাকটেরিয়া থাকলে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। এই প্রবণতা রুখতেই নতুন কৌশল নিয়ে কাজ চলছে, এমনকি জিন সম্পাদনার মাধ্যমে প্রতিরোধী জীবাণু দমন করার পথও খোঁজা হচ্ছে।
নতুন ওষুধ ও বিকল্প চিকিৎসা
ভারতের প্রেক্ষাপটে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক কতটা কার্যকর, তার তথ্য তৈরি করছেন গবেষকেরা। পাশাপাশি জীবাণুর পারস্পরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার মতো নতুন ধারণাও পরীক্ষাধীন। এতে জীবাণু একসঙ্গে ক্ষতিকর আচরণ করতে পারবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণার পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, হাত ধোয়া, জীবাণুনাশ এবং সঠিক ওষুধ ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
যক্ষ্মা চিকিৎসায় অগ্রগতি
ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা মোকাবিলায়ও এআইএমএসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিতে দীর্ঘ চিকিৎসার সময় কমে এসেছে এবং সাফল্যের হার বেড়েছে। আধুনিক জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত ওষুধ প্রতিরোধ শনাক্ত করে শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা, নতুন উদ্ভাবন এবং কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে প্রয়োগ করলেই ভারতে সুপারবাগের বিস্তার ধীর করা সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















