অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাত্র দেড় বছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে একের পর এক বড় সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং করদাতা সংখ্যা বাড়ানো—সবকিছু মিলিয়ে এই সময়কে এনবিআরের জন্য বেশ ঘটনাবহুল ও চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সংস্কারগুলোর মূল লক্ষ্য শুধু রাজস্ব আদায় বাড়ানো নয়, বরং কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব করে তোলা। এনবিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে এসব উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে শুরু করেছে।
রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করতে ২০২৫ সালের রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ জারি করে। প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে ব্যবসা বণ্টন বিধি সংশোধনের অনুমোদন দেয়, যার মাধ্যমে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি পৃথক বিভাগ কার্যকর করার পথ খুলে যায়। এটিকে এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কারে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কর ফাঁকি রোধ ও রাজস্ব আদায়ে গতি
নজরদারি জোরদার, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধে কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে আগের ফাঁকি দেওয়া কর আদায়েও গতি এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এনবিআর ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ হাজার ২০ কোটি টাকা বেশি।
অবকাঠামো উন্নয়নে বড় প্রকল্প
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রামে একটি আধুনিক কাস্টমস হাউস ও কাস্টমস একাডেমি নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নে চট্টগ্রামে অত্যাধুনিক কর ভবন নির্মাণের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হবে। খুলনায় কর ভবনের নির্মাণ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ এটি উদ্বোধনের প্রস্তুতি রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশল ও ডিজিটাল রূপান্তর
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এনবিআর ১০ বছরের মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশল গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণের হার বাড়ানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা। ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এগিয়ে নিতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংহতি জোরদার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যাতে এনবিআরের সব কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা যায়।
কর ছাড় সংস্কৃতি থেকে সরে আসার উদ্যোগ
ধীরে ধীরে কর অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে কর ব্যয় নীতি ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রণয়ন ও গেজেট করা হয়েছে। আয়কর আইন ২০২৩, কাস্টমস আইন ২০২৩ এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইনে সংশোধনের মাধ্যমে এনবিআরের কর ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন থেকে যেকোনো কর ছাড়ের জন্য সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আইনের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগ আস্থার চেষ্টা
ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২, কাস্টমস আইন ২০২৩, আয়কর আইন ২০২৩ এবং ভ্যাট বিধিমালা ২০১৬-এর নির্ভরযোগ্য ইংরেজি পাঠ গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
করদাতা সেবা ও করভিত্তি সম্প্রসারণ
আয়করভিত্তি বাড়াতে ১৩ হাজার ৫০০ জনকে আয়কর পেশাজীবী সনদ দেওয়া হয়েছে। এই পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়ায় প্রথমবারের মতো আয়কর পেশাজীবীরা সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

আমদানি ও রপ্তানিতে অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা
অর্থ বিভাগ সহযোগিতায় এনবিআর অনলাইন এ-চালান ব্যবস্থা চালু করেছে, যার মাধ্যমে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও তাদের সিএন্ডএফ এজেন্টরা সরাসরি সরকারি কোষাগারে শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে পারছেন। এই ব্যবস্থা আসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ও আইবাস প্লাস প্লাসের সঙ্গে যুক্ত, ফলে ব্যাংক হিসাব কিংবা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে পরিশোধ সম্ভব হচ্ছে। বিকাশ ইতোমধ্যে কোনো সার্ভিস চার্জ ছাড়াই এই সুবিধা চালু করেছে।
বাণিজ্য সহজীকরণ ও অংশীজন সংলাপ
বাণিজ্য সহজীকরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে এনবিআর প্রতি মাসে অংশীজনদের সঙ্গে সভা করছে। এসব সভায় ব্যবসায়ীরা মাঠপর্যায়ের কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়করসংক্রান্ত সমস্যা সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরতে পারছেন, যার ফলে দ্রুত সমাধান মিলছে।
সাইবার নিরাপত্তা জোরদার
জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী এনবিআরে একটি সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এটি দিনরাত সাইবার হামলা নজরদারি এবং কাস্টমস ও সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষায় কাজ করছে।
জনস্বার্থে কর ও শুল্ক ছাড়
হজের খরচ কমাতে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জন্য হজযাত্রীদের বিমান টিকিটে আবগারি শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন উৎসাহিত করতে মেট্রোরেলে ভ্যাট ছাড় ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
রমজানের আগে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ৪০ শতাংশ এবং অগ্রিম আয়কর ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। চাল, আলু, পেঁয়াজ, চিনি, ডিম, তাজা ফল, ভোজ্যতেল, ক্যানোলা তেল ও কীটনাশকের ওপর বিভিন্ন কর ও শুল্ক প্রত্যাহার করে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।
নতুন ব্যাগেজ বিধি ও মোবাইল শুল্ক হ্রাস
২০২৫ সালের নতুন ব্যাগেজ বিধি অনুযায়ী বছরে একটি নতুন মোবাইল ফোন শুল্ক ছাড়াই আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা বছরে দুটি ফোন শুল্কমুক্ত আনতে পারবেন। মোবাইল ফোন আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে এবং স্থানীয় সংযোজনকারীদের যন্ত্রাংশের ওপর শুল্কও কমানো হয়েছে, যা ফোনের দাম কমাতে সহায়ক হবে।
ভ্যাট ও আয়করে ডিজিটাল অগ্রগতি
অনলাইন ভ্যাট নিবন্ধন, ই-রিটার্ন, ই-পেমেন্ট, ই-রিফান্ড, স্মার্ট ইনভয়েস ও ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষাসহ ভ্যাটের ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশব্যাপী ভ্যাট নিবন্ধন অভিযানে ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন ব্যবসা ভ্যাটের আওতায় আসে। এতে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭৫ হাজারে।
অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড চালু হওয়ায় বিইএফটিএনের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে টাকা পাচ্ছেন করদাতারা। আয়করে অধিকাংশ করদাতার জন্য অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক হওয়ায় চলতি অর্থবছরে ৩৪ লাখের বেশি ই-রিটার্ন জমা পড়েছে।
কাস্টমসে একক জানালা ও বন্দর ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো চালু হওয়ায় ১৯টি সংস্থাকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে প্রায় ৯ লাখ সনদ, লাইসেন্স ও অনুমোদন অনলাইনে দেওয়া হয়েছে। শিপিং এজেন্ট ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের জন্য নতুন বিধিমালা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থাপনা, ট্রাক চলাচল নজরদারি এবং মূল্য নির্ধারণে ডিজিটাল স্বচ্ছতা আনা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন আটকে থাকা কনটেইনার নিলামের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ায় কনটেইনার জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সব মিলিয়ে নীতিগত সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্প সময়েই এনবিআরে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। এই উদ্যোগগুলো রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করেছে এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















