০৬:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
শেহবাজ-ইরান ফোনালাপ: যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতা শেহবাজ-ইরান ফোনালাপ: যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতা আবুধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ধ্বংসাবশেষে প্রাণহানি, উত্তেজনা নতুন মাত্রায় সিলেটে পুকুরে ডুবে শিশুমৃত্যু, বিষণ্নতায় ডুবল বিশ্বনাথ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তের পথে, তবে কিছু মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ, ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার ঘোষণা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির হরমুজ বন্ধ, বিশ্ব বাণিজ্যের ঝুঁকির নতুন মানচিত্র স্বাধীনতা দিবসে নওগাঁয় ১৭৫ শিল্পীর একমঞ্চে নজির, সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাসে মুখর শহর হবিগঞ্জে তাহেরীর মাহফিল ঘিরে উত্তেজনা, ১৪৪ ধারা জারি বৈদ্যুতিক বাসে রূপান্তর, চাকরি হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন এপিএসআরটিসি কর্মীরা

শব্দে শব্দে বিভাজনের বিরুদ্ধে: সাহিত্য উৎসবে সহাবস্থানের সন্ধান

ক্রমশ বিভক্ত ও মেরুকৃত এক বিশ্বে সহাবস্থান, সহনশীলতা আর গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন ঘিরে যখন রাজনীতি ও সমাজে তীব্র টানাপোড়েন, তখন ভারতের বিভিন্ন সাহিত্য উৎসব হয়ে উঠছে কথোপকথনের এক বিরল পরিসর। কলকাতা থেকে চেন্নাই, কোঝিকোড় থেকে জয়পুর—দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব সাহিত্য মঞ্চে লেখক, চিন্তক, শিল্পী ও পাঠকেরা মিলিত হচ্ছেন একটাই প্রশ্ন নিয়ে, আমরা কি একসঙ্গে থাকতে পারি।

ভবিষ্যতের জন্য শব্দ সংরক্ষণ
নরওয়ের ফিউচার লাইব্রেরি প্রকল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শব্দ সংরক্ষণের এক অনন্য উদ্যোগ। একশ বছরের এই প্রকল্পে বিশ্বজুড়ে নির্বাচিত লেখকেরা এমন পাণ্ডুলিপি জমা দিচ্ছেন, যা উন্মোচিত হবে আগামী শতাব্দীতে। এই বছর সেখানে নিজের লেখা তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত অমিতাভ ঘোষের। যুদ্ধ, বাড়তে থাকা গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ, লিঙ্গ, বর্ণ ও ধর্মীয় বিভাজন এবং চরমপন্থার উত্থানে ভরা বর্তমান সময়ের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে সেই চিঠি। অস্থিরতার সময়ে লেখকেরাই বিশৃঙ্খল ঘটনাপ্রবাহকে অর্থ দেন, মানবিক ও নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলেন।

সহাবস্থানের পাঠশালা হিসেবে সাহিত্য উৎসব
বই তার সর্বোত্তম রূপে সেতু তৈরি করে। জাতীয়তা, জাতি, বর্ণ, শ্রেণি কিংবা পূর্বাগ্রহের দেয়াল পেরিয়ে মানুষকে যুক্ত করে। সাহিত্য উৎসবগুলো তাই ধীরে ধীরে নিরাপদ এক যৌথ পরিসরে পরিণত হয়েছে, যেখানে কঠিন প্রশ্ন তোলা যায়। এ বছরের আলোচনায় বারবার ফিরে এসেছে সহাবস্থানের বিষয়টি—কোথায় তা ভাঙছে, কেন সহনশীলতা আজ রক্ষার মতো এক মূল্যবোধ।

আলোচনায় বসার সময়
পাঠকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শশী থারুর দেখছেন এক ধরনের অস্বস্তি ও উদ্বেগ। তাঁর মতে, ভারতের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য, যেখানে নানা স্বাদ একসঙ্গে থেকেও নিজস্বতা বজায় রাখে, তা মুছে গিয়ে একরকম একঘেয়ে ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি মনে করেন, নিছক সহনশীলতার বাইরে গিয়ে সক্রিয় গ্রহণযোগ্যতার পথে হাঁটতে হবে। সাহিত্যই সেই পথ দেখাতে পারে, কারণ অন্যের জীবনে ঢুকে তার অভিজ্ঞতা অনুভব করার শক্তি বইয়েরই আছে।

WORDS AGAINST THE DIVIDE - PressReader

ইতিহাস, বিজ্ঞান আর বর্তমান
বিজ্ঞান লেখক লরা স্পিনির মতে, অতীত নিয়ে আজকের বিতর্ক অতিমাত্রায় মেরুকৃত। তাই আবেগ নয়, প্রমাণভিত্তিক আলোচনা জরুরি। কিছু প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নাও মিলতে পারে, কিন্তু অতীতের চেয়ে আমরা আজ কারা, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গিই সহাবস্থানের বোধকে শক্তিশালী করতে পারে।

গণতন্ত্র ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন
অর্থনীতিবিদ অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম মনে করেন, সাহিত্য উৎসব সমাজের প্রবণতার প্রতিফলন ঘটায় এবং নাগরিক আলোচনার জায়গা তৈরি করে। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে রয়েছে গণতন্ত্র, প্রতিষ্ঠান, অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতিসত্তা। শশী থারুরও সতর্ক করে দিয়েছেন ধর্ম বা পরিচয়ভিত্তিক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। সংবিধান ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর নাগরিক জাতীয়তাবাদই ভারতের শক্তি ছিল, যা আজ চাপের মুখে।

অন্যকে শত্রু বানানোর রাজনীতি
লেখক সন্দীপ রায় বলছেন, বিশ্বজুড়ে অন্যকে শত্রু বানানোর প্রবণতা বাড়ছে। ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, উচ্চারণ বা ত্বকের রং—সবই হয়ে উঠছে সন্দেহের চিহ্ন। আলোকচিত্রী ও গল্পকার জিম উনগ্রামিয়াও কাসম মনে করেন, বহুভাষিক সমাজে পার্থক্যের মধ্যেই নিরাপত্তা খুঁজে নিতে শিখতে হবে। ভারতের বড় শিক্ষা হলো, এখানে সবাই কোথাও না কোথাও সংখ্যালঘু।

আশার ঠিকানা শব্দ
আন্তর্জাতিক বুকারজয়ী বানু মুস্তাকের বিশ্বাস, সত্য যখন আক্রমণের মুখে, তখন লেখার দায়িত্ব আরও গভীর হয়। লেখা নীরবতা ভাঙার উপায়। পাঠকদের প্রতিক্রিয়াও সেই আশার ইঙ্গিত দেয়। সাহিত্য উৎসবে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সমতার প্রশ্নে দর্শকের সংবেদনশীল উপস্থিতি প্রমাণ করে, চিন্তাশীল পাঠকসমাজ এখনো আছে।

চ্যালেঞ্জের মুখে সাহিত্য উৎসব
তবু চাপ আছে। কী আলোচনা হবে, কে কথা বলবে—এসব নিয়েও সংশয়। সহাবস্থানের পক্ষে কথা বলাই অনেক সময় কঠিন হয়ে উঠছে। তবুও নাগা জনগোষ্ঠীর শিল্পীদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় গর্বের সঙ্গে তুলে ধরা দেখিয়ে দেয়, অন্তর্ভুক্তি কেবল ধারণা নয়, বাস্তব চর্চাও হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

শেহবাজ-ইরান ফোনালাপ: যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতা

শব্দে শব্দে বিভাজনের বিরুদ্ধে: সাহিত্য উৎসবে সহাবস্থানের সন্ধান

০১:০০:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

ক্রমশ বিভক্ত ও মেরুকৃত এক বিশ্বে সহাবস্থান, সহনশীলতা আর গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন ঘিরে যখন রাজনীতি ও সমাজে তীব্র টানাপোড়েন, তখন ভারতের বিভিন্ন সাহিত্য উৎসব হয়ে উঠছে কথোপকথনের এক বিরল পরিসর। কলকাতা থেকে চেন্নাই, কোঝিকোড় থেকে জয়পুর—দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব সাহিত্য মঞ্চে লেখক, চিন্তক, শিল্পী ও পাঠকেরা মিলিত হচ্ছেন একটাই প্রশ্ন নিয়ে, আমরা কি একসঙ্গে থাকতে পারি।

ভবিষ্যতের জন্য শব্দ সংরক্ষণ
নরওয়ের ফিউচার লাইব্রেরি প্রকল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শব্দ সংরক্ষণের এক অনন্য উদ্যোগ। একশ বছরের এই প্রকল্পে বিশ্বজুড়ে নির্বাচিত লেখকেরা এমন পাণ্ডুলিপি জমা দিচ্ছেন, যা উন্মোচিত হবে আগামী শতাব্দীতে। এই বছর সেখানে নিজের লেখা তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত অমিতাভ ঘোষের। যুদ্ধ, বাড়তে থাকা গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ, লিঙ্গ, বর্ণ ও ধর্মীয় বিভাজন এবং চরমপন্থার উত্থানে ভরা বর্তমান সময়ের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে সেই চিঠি। অস্থিরতার সময়ে লেখকেরাই বিশৃঙ্খল ঘটনাপ্রবাহকে অর্থ দেন, মানবিক ও নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলেন।

সহাবস্থানের পাঠশালা হিসেবে সাহিত্য উৎসব
বই তার সর্বোত্তম রূপে সেতু তৈরি করে। জাতীয়তা, জাতি, বর্ণ, শ্রেণি কিংবা পূর্বাগ্রহের দেয়াল পেরিয়ে মানুষকে যুক্ত করে। সাহিত্য উৎসবগুলো তাই ধীরে ধীরে নিরাপদ এক যৌথ পরিসরে পরিণত হয়েছে, যেখানে কঠিন প্রশ্ন তোলা যায়। এ বছরের আলোচনায় বারবার ফিরে এসেছে সহাবস্থানের বিষয়টি—কোথায় তা ভাঙছে, কেন সহনশীলতা আজ রক্ষার মতো এক মূল্যবোধ।

আলোচনায় বসার সময়
পাঠকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শশী থারুর দেখছেন এক ধরনের অস্বস্তি ও উদ্বেগ। তাঁর মতে, ভারতের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য, যেখানে নানা স্বাদ একসঙ্গে থেকেও নিজস্বতা বজায় রাখে, তা মুছে গিয়ে একরকম একঘেয়ে ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি মনে করেন, নিছক সহনশীলতার বাইরে গিয়ে সক্রিয় গ্রহণযোগ্যতার পথে হাঁটতে হবে। সাহিত্যই সেই পথ দেখাতে পারে, কারণ অন্যের জীবনে ঢুকে তার অভিজ্ঞতা অনুভব করার শক্তি বইয়েরই আছে।

WORDS AGAINST THE DIVIDE - PressReader

ইতিহাস, বিজ্ঞান আর বর্তমান
বিজ্ঞান লেখক লরা স্পিনির মতে, অতীত নিয়ে আজকের বিতর্ক অতিমাত্রায় মেরুকৃত। তাই আবেগ নয়, প্রমাণভিত্তিক আলোচনা জরুরি। কিছু প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নাও মিলতে পারে, কিন্তু অতীতের চেয়ে আমরা আজ কারা, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গিই সহাবস্থানের বোধকে শক্তিশালী করতে পারে।

গণতন্ত্র ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন
অর্থনীতিবিদ অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম মনে করেন, সাহিত্য উৎসব সমাজের প্রবণতার প্রতিফলন ঘটায় এবং নাগরিক আলোচনার জায়গা তৈরি করে। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে রয়েছে গণতন্ত্র, প্রতিষ্ঠান, অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতিসত্তা। শশী থারুরও সতর্ক করে দিয়েছেন ধর্ম বা পরিচয়ভিত্তিক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। সংবিধান ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর নাগরিক জাতীয়তাবাদই ভারতের শক্তি ছিল, যা আজ চাপের মুখে।

অন্যকে শত্রু বানানোর রাজনীতি
লেখক সন্দীপ রায় বলছেন, বিশ্বজুড়ে অন্যকে শত্রু বানানোর প্রবণতা বাড়ছে। ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, উচ্চারণ বা ত্বকের রং—সবই হয়ে উঠছে সন্দেহের চিহ্ন। আলোকচিত্রী ও গল্পকার জিম উনগ্রামিয়াও কাসম মনে করেন, বহুভাষিক সমাজে পার্থক্যের মধ্যেই নিরাপত্তা খুঁজে নিতে শিখতে হবে। ভারতের বড় শিক্ষা হলো, এখানে সবাই কোথাও না কোথাও সংখ্যালঘু।

আশার ঠিকানা শব্দ
আন্তর্জাতিক বুকারজয়ী বানু মুস্তাকের বিশ্বাস, সত্য যখন আক্রমণের মুখে, তখন লেখার দায়িত্ব আরও গভীর হয়। লেখা নীরবতা ভাঙার উপায়। পাঠকদের প্রতিক্রিয়াও সেই আশার ইঙ্গিত দেয়। সাহিত্য উৎসবে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সমতার প্রশ্নে দর্শকের সংবেদনশীল উপস্থিতি প্রমাণ করে, চিন্তাশীল পাঠকসমাজ এখনো আছে।

চ্যালেঞ্জের মুখে সাহিত্য উৎসব
তবু চাপ আছে। কী আলোচনা হবে, কে কথা বলবে—এসব নিয়েও সংশয়। সহাবস্থানের পক্ষে কথা বলাই অনেক সময় কঠিন হয়ে উঠছে। তবুও নাগা জনগোষ্ঠীর শিল্পীদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় গর্বের সঙ্গে তুলে ধরা দেখিয়ে দেয়, অন্তর্ভুক্তি কেবল ধারণা নয়, বাস্তব চর্চাও হতে পারে।