পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও সময়কে হার মানানো এক নাম আগাথা ক্রিস্টি। খুন, রহস্য আর মানবমনের অন্ধকার দিক নিয়ে তাঁর গল্প আজও পাঠককে টানে একই উত্তেজনা আর কৌতূহলে। মৃত্যুর অর্ধশতক পরেও কেন তিনি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় রহস্যকাহিনি লেখকদের শীর্ষে, তার পেছনের গল্পেই এই প্রতিবেদন।
শৈশব থেকেই কল্পনার জগতে বসবাস
১৮৯০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের উপকূলীয় শহর টর্কেতে জন্ম আগাথা মেরি ক্লারিসা মিলারের। সচ্ছল পরিবারে বড় হলেও তাঁর শৈশব কেটেছে বই আর কল্পনার ভেতর। চার বছর বয়সেই পড়তে শেখা আগাথা ছোটবেলা থেকেই গল্পে ডুবে থাকতেন। লুইসা মে অলকট, এডিথ নেসবিট আর লুইস ক্যারলের লেখা তাঁর কল্পনাশক্তিকে শানিত করে।
লেখালেখির পথে প্রথম পদক্ষেপ
এগারো বছর বয়সে লন্ডনের উপকণ্ঠের ট্রাম নিয়ে লেখা একটি কবিতা স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটিই তাঁর লেখকজীবনের প্রথম স্বীকৃতি। পরে প্যারিসে সংগীত শেখার সময় পিয়ানো ও গানের স্বপ্ন দেখলেও মঞ্চভীতি সেই পথ বন্ধ করে দেয়। তখনই কলম হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে শক্ত ভরসা।

যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আর বিষের নিখুঁত জ্ঞান
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আগাথা ক্রিস্টির জীবনে বড় মোড় এনে দেয়। স্বামী যুদ্ধে গেলে তিনি রেড ক্রসের নার্স হিসেবে কাজ করেন। পরে ওষুধ প্রস্তুতির প্রশিক্ষণ নিয়ে ফার্মাসিতে কাজ করার সময় বিষ ও রাসায়নিক সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। এই অভিজ্ঞতাই তাঁর রহস্যকাহিনিকে করে তোলে বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য।
হারকিউল পোয়ারোর জন্ম
বড় বোনের উৎসাহে লেখা প্রথম উপন্যাস দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস-এর মাধ্যমে জন্ম নেয় হারকিউল পোয়ারো। প্রকাশের আগে গল্পের শেষাংশে পরিবর্তন আনতে হলেও বইটি পাঠক ও সমালোচকদের প্রশংসা পায়। বিশেষ করে বিষ ব্যবহারের নিখুঁত বর্ণনা তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।
সাফল্যের ছায়ায় ব্যক্তিগত অন্ধকার
বিশের দশকের মাঝামাঝি সময় ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। মায়ের মৃত্যু আর দাম্পত্য জীবনের ভাঙন তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এক পর্যায়ে তিনি নিখোঁজ হয়ে পড়েন। দেশজুড়ে আলোচনার পর এগারো দিন পরে অন্য শহরের এক হোটেলে তাঁকে পাওয়া যায়। পরে তিনি জানান, সেই সময়ের অনেক কিছুই তাঁর মনে নেই।
ফিরে দাঁড়িয়ে সোনালি সময়
এই সংকট কাটিয়ে আগাথা আবার কলম ধরেন। ত্রিশের দশকে একের পর এক কালজয়ী উপন্যাস লেখেন তিনি। ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে খুন, নীল নদের তীরে মৃত্যু কিংবা মেসোপটেমিয়ায় খুন—সব গল্পেই ফুটে ওঠে তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এই সময়েই পাঠক পরিচিত হয় মিস মার্পলের সঙ্গে, শান্ত গ্রামের এক বৃদ্ধা নারী, যাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি জটিল রহস্য ভেদ করে।

সবচেয়ে অন্ধকার অথচ সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্প
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে প্রকাশিত অ্যান্ড দেন দেয়ার ওয়ার নান হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বই। একটি দ্বীপে একে একে মানুষ খুন হওয়ার গল্পে যুদ্ধকালীন আতঙ্ক আর মানবমনের নিষ্ঠুরতা স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
মঞ্চে বিশ্বরেকর্ড
রেডিও নাটক হিসেবে লেখা থ্রি ব্লাইন্ড মাইস পরে রূপ নেয় দ্য মাউসট্র্যাপে। লন্ডনের মঞ্চে এই নাটক টানা প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘদিন মঞ্চস্থ নাটকের স্বীকৃতি পায়।
নিঃসঙ্গতা আর রাষ্ট্রীয় সম্মান
খ্যাতির শীর্ষে থেকেও আগাথা ক্রিস্টি ছিলেন ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গোপনীয়। বইয়ের মলাটে নিজের ছবি ছাপাতেও অনীহা ছিল তাঁর। তবু সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান।
অমর উত্তরাধিকার
১৯৭৬ সালে আগাথা ক্রিস্টি শান্তভাবে মৃত্যুবরণ করেন। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, তিনি আজও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া কথাসাহিত্যিক। দুই শত কোটির বেশি কপি বিক্রি হওয়া তাঁর বই প্রমাণ করে, রহস্যের যে জগৎ তিনি সৃষ্টি করেছেন, তা কখনো পুরোনো হয় না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















