ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় বা প্রামাণ্যচিত্রে বন্দি কোনো বিষয় নয়। ভারতের অসংখ্য প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভে দাঁড়িয়ে আজও ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ আছে মানুষের। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকে বারবার ভোঁতা করে দিচ্ছে ভুল, অসম্পূর্ণ আর পুরোনো তথ্য। ভারতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যাখ্যার দারিদ্র্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন ইতিহাসবিদ শশাঙ্ক শেখর সিনহা। তাঁর নতুন বই বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভকে কেন্দ্র করে ইতিহাস বোঝার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করেছে এবং সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারও অর্জন করেছে।
ভারতের স্মৃতিস্তম্ভে ইতিহাস হারিয়ে যাওয়ার গল্প
মধ্যপ্রদেশের মান্ডু দুর্গনগরীতে ঘুরতে গিয়ে এক স্থানীয় গাইডের বর্ণনা শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন শশাঙ্ক শেখর সিনহা। গল্পগুলো এতটাই ভুল আর কল্পনাপ্রসূত ছিল যে, ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদ, মসজিদ আর জলাধারগুলো যতটা সমৃদ্ধ, সেগুলোর ব্যাখ্যা ততটাই ইতিহাসহীন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ইতিহাস পড়ানোর অভিজ্ঞতা আর প্রকাশনা জগতে কাজ করার পর সিনহা বুঝেছিলেন, গবেষণা আর সাধারণ মানুষের বোঝাপড়ার মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গাইডবই বছরের পর বছর হালনাগাদ না হওয়ায় নতুন গবেষণার সঙ্গে মানুষের সংযোগ তৈরি হচ্ছে না।
স্মৃতিস্তম্ভকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের নতুন ভাষা
এই অভিজ্ঞতা থেকেই শুরু হয় তাঁর বইয়ের ধারাবাহিক উদ্যোগ। এই ধারার দ্বিতীয় বই বৌদ্ধ ধর্মের স্মৃতিস্তম্ভকে কেন্দ্র করে রচিত, যা সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। বিচারকদের মতে, এই বই প্রথাগত পাঠ্যনির্ভর ইতিহাসচর্চা থেকে সরে এসে শিল্প, স্থাপত্য আর ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে ইতিহাসকে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্মীয় বিকৃতির সময়ে এই লেখা স্পষ্ট, সহজপাঠ্য এবং গবেষণাভিত্তিক।
সিনহার লক্ষ্য ছিল একটাই, ইতিহাসকে এমনভাবে বলা যাতে তা গবেষণার গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়। তাঁর মতে, স্মৃতিস্তম্ভ এমন এক জায়গা যেখানে মানুষ নিজেই ইতিহাস অনুভব করতে পারে। কিন্তু ভুল তথ্য সেই সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়।

বুদ্ধের পথ ধরে স্মৃতিস্তম্ভের যাত্রা
বইটিতে বুদ্ধের জীবনের সঙ্গে যুক্ত স্থানগুলোকে ধরে ধরে এগোনো হয়েছে। উত্তর প্রদেশের কুশীনগর থেকে শুরু করে সারনাথ, নেপালের লুম্বিনি পর্যন্ত বিস্তৃত এই যাত্রায় বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ আর প্রথম ধর্মপ্রচার স্থান পেয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে চারটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। বিহারের বোধগয়ায় মহাবোধি মন্দির, মধ্যপ্রদেশের সাঁচির স্তূপসমূহ, মহারাষ্ট্রের অজন্তা গুহা এবং প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাবিহার।
এই সব স্থাপনার দিকে তাকিয়ে কী জানা উচিত, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন সিনহা। নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণার আলোকে তিনি বহু প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ভুল ধারণা ভাঙার চেষ্টা
সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কেবল আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন এবং পার্থিব বিষয় থেকে দূরে থাকতেন। কিন্তু সাঁচির শিলালিপি জানাচ্ছে ভিন্ন কথা। সেখানে দেখা যায়, ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীরাই ছিলেন উল্লেখযোগ্য দাতা। তাঁদের হাতে ছিল সম্পদ ও প্রভাব, আর তাঁদের উদ্যোগেই গড়ে উঠেছিল বহু স্তূপ ও বিহার।
বৌদ্ধ ধর্মের পতন আর পুনরুত্থান
ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব কমতে থাকে। তবুও অনেক শিক্ষা কেন্দ্র টিকে থাকে এবং আজও হিমাচলের লাহুল স্পিতি, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে তিব্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
বইয়ের শেষাংশে ঔপনিবেশিক ভারতের বৌদ্ধ পুনর্জাগরণের কথাও উঠে এসেছে। সমতার ভাবনায় আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলন বৌদ্ধ চিন্তাকে সামনে আনে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাচীন বৌদ্ধ শিল্পকে ব্যবহার করেন আধুনিক ভারতীয় শিল্পকে নতুন রূপ দিতে। স্বাধীনতার পর কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়তেও বৌদ্ধ দর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর ১৯৫৬ সালে নাগপুরে ড. আম্বেদকরের নেতৃত্বে গণধর্মান্তর ছিল জাতিভেদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
ইতিহাস ছড়িয়ে দেওয়ার নতুন চ্যালেঞ্জ
সিনহার মতে, ইতিহাসকে মানুষের জীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে যোগাযোগের পদ্ধতি বদলাতে হবে। সহজ, সৃজনশীল আর বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে ইতিহাস বলতে না পারলে মানুষ ভরসা করবে বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর। প্রকৃত ইতিহাস জানাই সমাজে সহমর্মিতা, শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধকে শক্ত করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















