০৬:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
প্রজাতন্ত্রে আদিবাসীদের প্রাপ্য কি সত্যিই নিশ্চিত হয়েছে? প্রতীক নয়, ন্যায্যতা: প্রজাতন্ত্রের অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি নিয়ে শৈলজা পাইকের কথা আগাথা ক্রিস্টি কেন আজও রহস্যের রানী ইতিহাসকে নতুন করে দেখার আহ্বান, বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভে সত্যের আলো ফেললেন শশাঙ্ক শেখর সিনহা শব্দে শব্দে বিভাজনের বিরুদ্ধে: সাহিত্য উৎসবে সহাবস্থানের সন্ধান পঞ্চান্নে স্বয়ম্বর, মধ্যবয়সে বিদ্রোহ: সোনোরা ঝা উপন্যাসে নারীর আকাঙ্ক্ষার নতুন ভাষা এআইএমএসের লড়াইয়ে সুপারবাগ, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যর্থ হলে ভরসা গবেষণা ও দ্রুত শনাক্তকরণ ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যু, শ্বশুরের করা হত্যা মামলা নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে একটি পক্ষ উঠেপড়ে লেগেছে: তারেক রহমান রাতে বাগ্‌বিতণ্ডার পর সকালে ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনী কার্যালয়ে আগুন

প্রতীক নয়, ন্যায্যতা: প্রজাতন্ত্রের অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি নিয়ে শৈলজা পাইকের কথা

রিপাবলিক ডে এলে অনেক কথাই বলা হয়। কিন্তু ইতিহাসবিদ Shailaja Paik মনে করিয়ে দেন—প্রতীক দিয়ে সমতা আসে না। আসে নৈতিক দায়িত্ব থেকে।

২০২৪ সালের ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ পাওয়া শৈলজা পাইক তাঁর গবেষণাজীবন উৎসর্গ করেছেন দলিত নারীদের ইতিহাস উদ্ধার করতে। যেসব গল্প দীর্ঘদিন ধরে নথি থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। তাঁর মতে, প্রজাতন্ত্র তখনই সফল হবে, যখন বাদ পড়াদের মানবিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেবে।

একটি দৃশ্য আজও তাঁর সঙ্গে থাকে। আট বছর বয়সে মহারাষ্ট্রের গ্রামে একটি কুয়োর ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। জল তুলতে মানা করা হলো। সামনে আসছে প্রভাবশালী জাতের নারীরা। কয়েক ফুটের সেই দূরত্ব—অদৃশ্য কিন্তু কঠোর—আজীবনের পাঠ হয়ে রইল। “দূরত্ব মানতেই হতো,” তিনি বলেন।

শিক্ষা: মুক্তির পথ, বৈষম্যের আয়না

পুনের বস্তি আর গ্রামের যাতায়াতেই কেটেছে তাঁর শৈশব। শহরের জীবন ছিল কষ্টের। তবু শিক্ষা বদল আনতে পারে—এই বিশ্বাসে তাঁর বাবা-মা চার মেয়েকেই ইংরেজি মাধ্যমে পড়ান।

ইংরেজি আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। সুযোগও। কিন্তু বৈষম্য যায়নি। স্কুলে প্রকাশ্যে এসসি শিক্ষার্থীদের দাঁড় করানো। পূজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না পাওয়া। কলেজে রিজার্ভেশন নিয়ে বিদ্রূপ। এসব তাঁর নিত্য অভিজ্ঞতা।

পরে পিএইচডি করার সময়ও দেখেছেন—মেয়ের স্কুলের দরজায় ঝুলছে এসসি/এসটি তালিকা। তখনও বলা হয়, বৈষম্য নেই।

নথির নীরবতা, মুখের ইতিহাস

দলিত নারীদের শিক্ষা নিয়ে গবেষণায় গিয়ে পাইক দেখেন—নথিতে শূন্যতা। ইতিহাসে নেই তাদের সংগঠন, প্রতিবাদ, বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম।

তিনি আশ্রয় নেন মৌখিক ইতিহাসে। কথা বলেন সেই নারীদের সঙ্গে, যারা গ্রামে গ্রামে পাঠাগার গড়েছেন, সম্মেলন করেছেন, উচ্চবর্ণের নেতাদের প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করেছেন। অনেক সময় একই সম্মেলনে বসার জায়গা মিললেও, খাওয়ার সময় আলাদা করে বসতে বলা হয়েছে। তারা মেনে নেয়নি।

তাঁর কাজ দেখায়—কিভাবে দলিত নারীদের শ্রম অদৃশ্য করা হয়েছে। কিভাবে ‘যোগ্যতা’ আর ‘জ্ঞান’ কেবল নির্দিষ্ট জাতের সম্পত্তি হয়ে উঠেছে।

ভাষা, রাজনীতি ও নৈতিকতার প্রশ্ন

আজকের জাতভিত্তিক রাজনীতিতে পাইক দেখেন এক বিপজ্জনক উলটপুরাণ। ক্ষমতাবানরা নিজেদের নিপীড়িত বলে দাবি করছে। তাঁর ভাষায়, এটি নৈতিক ব্যর্থতা।

রিজার্ভেশন বিতর্ক নিয়েও তিনি সমালোচনামুখর। বাস্তবতা না বুঝে একই যুক্তি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

ভাষার প্রশ্নেও তাঁর অবস্থান সূক্ষ্ম। ইংরেজি তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার ভেতরেও জাতের শ্রেণিবিন্যাস আছে। প্রশ্ন হলো—কোন ভাষা কাকে জায়গা দেয়, কাকে বাদ দেয়।

আজ যখন আম্বেদকরের নাম সর্বত্র উচ্চারিত, পাইক সতর্ক করেন। প্রতীকী শ্রদ্ধা যথেষ্ট নয়। নৈতিক চর্চা দরকার। তাঁর কথায়, “আপনি কি সত্যিই তাঁর ভাবনা অনুসরণ করছেন?”

প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর আশা স্পষ্ট। সমতা শুধু সংবিধানে লেখা থাকলে চলবে না। তা জীবনে বাস্তব হতে হবে। “এরা মানুষ,” তিনি বলেন। “প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব, সেটা নিশ্চিত করা।”

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রজাতন্ত্রে আদিবাসীদের প্রাপ্য কি সত্যিই নিশ্চিত হয়েছে?

প্রতীক নয়, ন্যায্যতা: প্রজাতন্ত্রের অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি নিয়ে শৈলজা পাইকের কথা

০৫:০০:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

রিপাবলিক ডে এলে অনেক কথাই বলা হয়। কিন্তু ইতিহাসবিদ Shailaja Paik মনে করিয়ে দেন—প্রতীক দিয়ে সমতা আসে না। আসে নৈতিক দায়িত্ব থেকে।

২০২৪ সালের ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ পাওয়া শৈলজা পাইক তাঁর গবেষণাজীবন উৎসর্গ করেছেন দলিত নারীদের ইতিহাস উদ্ধার করতে। যেসব গল্প দীর্ঘদিন ধরে নথি থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। তাঁর মতে, প্রজাতন্ত্র তখনই সফল হবে, যখন বাদ পড়াদের মানবিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেবে।

একটি দৃশ্য আজও তাঁর সঙ্গে থাকে। আট বছর বয়সে মহারাষ্ট্রের গ্রামে একটি কুয়োর ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। জল তুলতে মানা করা হলো। সামনে আসছে প্রভাবশালী জাতের নারীরা। কয়েক ফুটের সেই দূরত্ব—অদৃশ্য কিন্তু কঠোর—আজীবনের পাঠ হয়ে রইল। “দূরত্ব মানতেই হতো,” তিনি বলেন।

শিক্ষা: মুক্তির পথ, বৈষম্যের আয়না

পুনের বস্তি আর গ্রামের যাতায়াতেই কেটেছে তাঁর শৈশব। শহরের জীবন ছিল কষ্টের। তবু শিক্ষা বদল আনতে পারে—এই বিশ্বাসে তাঁর বাবা-মা চার মেয়েকেই ইংরেজি মাধ্যমে পড়ান।

ইংরেজি আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। সুযোগও। কিন্তু বৈষম্য যায়নি। স্কুলে প্রকাশ্যে এসসি শিক্ষার্থীদের দাঁড় করানো। পূজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না পাওয়া। কলেজে রিজার্ভেশন নিয়ে বিদ্রূপ। এসব তাঁর নিত্য অভিজ্ঞতা।

পরে পিএইচডি করার সময়ও দেখেছেন—মেয়ের স্কুলের দরজায় ঝুলছে এসসি/এসটি তালিকা। তখনও বলা হয়, বৈষম্য নেই।

নথির নীরবতা, মুখের ইতিহাস

দলিত নারীদের শিক্ষা নিয়ে গবেষণায় গিয়ে পাইক দেখেন—নথিতে শূন্যতা। ইতিহাসে নেই তাদের সংগঠন, প্রতিবাদ, বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম।

তিনি আশ্রয় নেন মৌখিক ইতিহাসে। কথা বলেন সেই নারীদের সঙ্গে, যারা গ্রামে গ্রামে পাঠাগার গড়েছেন, সম্মেলন করেছেন, উচ্চবর্ণের নেতাদের প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করেছেন। অনেক সময় একই সম্মেলনে বসার জায়গা মিললেও, খাওয়ার সময় আলাদা করে বসতে বলা হয়েছে। তারা মেনে নেয়নি।

তাঁর কাজ দেখায়—কিভাবে দলিত নারীদের শ্রম অদৃশ্য করা হয়েছে। কিভাবে ‘যোগ্যতা’ আর ‘জ্ঞান’ কেবল নির্দিষ্ট জাতের সম্পত্তি হয়ে উঠেছে।

ভাষা, রাজনীতি ও নৈতিকতার প্রশ্ন

আজকের জাতভিত্তিক রাজনীতিতে পাইক দেখেন এক বিপজ্জনক উলটপুরাণ। ক্ষমতাবানরা নিজেদের নিপীড়িত বলে দাবি করছে। তাঁর ভাষায়, এটি নৈতিক ব্যর্থতা।

রিজার্ভেশন বিতর্ক নিয়েও তিনি সমালোচনামুখর। বাস্তবতা না বুঝে একই যুক্তি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

ভাষার প্রশ্নেও তাঁর অবস্থান সূক্ষ্ম। ইংরেজি তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার ভেতরেও জাতের শ্রেণিবিন্যাস আছে। প্রশ্ন হলো—কোন ভাষা কাকে জায়গা দেয়, কাকে বাদ দেয়।

আজ যখন আম্বেদকরের নাম সর্বত্র উচ্চারিত, পাইক সতর্ক করেন। প্রতীকী শ্রদ্ধা যথেষ্ট নয়। নৈতিক চর্চা দরকার। তাঁর কথায়, “আপনি কি সত্যিই তাঁর ভাবনা অনুসরণ করছেন?”

প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর আশা স্পষ্ট। সমতা শুধু সংবিধানে লেখা থাকলে চলবে না। তা জীবনে বাস্তব হতে হবে। “এরা মানুষ,” তিনি বলেন। “প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব, সেটা নিশ্চিত করা।”