চার দলীয় জোট সরকারের সময় বিএনপি যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে সে সময় সরকারে থাকা জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতা কেন পদত্যাগ করেননি—এই প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ময়মনসিংহে এক নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তখন সরকারে থাকা নেতারা ভালো করেই জানতেন খালেদা জিয়া দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতেন না।
ময়মনসিংহের জনসভায় তারেক রহমানের বক্তব্য
মঙ্গলবার বিকেলে ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনি জনসভায় তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে একটি রাজনৈতিক দল বিএনপির বিরুদ্ধে এমন ভাষা ব্যবহার করছে, যা একসময় পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের মুখে শোনা যেত। বিএনপিকে দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন বলার আগে তাদের নিজেদের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, দুই হাজার এক থেকে দুই হাজার ছয় সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে জামায়াতের দুইজন শীর্ষ নেতা মন্ত্রী ছিলেন। যদি বিএনপি এতটাই খারাপ হতো, তাহলে তারা কেন পদত্যাগ করে সরকার ছেড়ে চলে আসেননি। তার ভাষায়, তারা পদত্যাগ করেননি কারণ তারা জানতেন খালেদা জিয়া কঠোর হাতে দুর্নীতি দমন করছিলেন।
জামায়াতের মন্ত্রীত্বকাল ও তারেক রহমানের যুক্তি
তারেক রহমান স্মরণ করিয়ে দেন, ওই সময় জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রীত্ব পেয়েছিলেন। নিজামী কৃষি ও পরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং মুজাহিদ ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী। তারেক রহমান বলেন, সরকারের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত তাদের সরকারে থাকা প্রমাণ করে, বিএনপি সম্পর্কে এখন যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা নিজেরাই মিথ্যা প্রমাণ করছে।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী খালেদা জিয়ার সময় বাংলাদেশ দুর্নীতিতে নিম্নমুখী ধারায় ছিল। দুই হাজার এক সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশ ধীরে ধীরে দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একাত্তরের মতো ঐক্যের আহ্বান
আসন্ন নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, একাত্তরের যুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক গণআন্দোলন—কোনো সময়ই মানুষ ধর্ম, অঞ্চল বা পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়নি। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে ছিল। সেই ঐক্যই আবার গড়ে তুলতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, আমরা একসাথে থাকলে যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তেমনি একসাথে থাকলেই স্বৈরাচার বিদায় করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতেও ঐক্য ধরে রাখতে পারলে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। তার ভাষায়, একটাই স্লোগান সামনে রাখতে হবে—করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।

ভোটকেন্দ্র পাহারার নির্দেশনা
ভোটের দিন সকাল থেকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ভোট দিয়ে কেন্দ্র ছেড়ে চলে আসলে হবে না। ভোটকেন্দ্রে থেকে পাহারা দিতে হবে, যাতে কেউ ভোট লুট করতে না পারে। বহু বছর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না পাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সবাইকে সজাগ থাকার অনুরোধ জানান।
কৃষি ও খাল পুনর্খননের অঙ্গীকার
ময়মনসিংহকে কৃষিপ্রধান জেলা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, একসময় এই অঞ্চলে অসংখ্য খাল-বিল ছিল, যা এখন ভরাট হয়ে গেছে। তিনি খাল পুনর্খননের ঘোষণা দিয়ে বলেন, এ কাজে তিনি নিজেও জনগণের সঙ্গে থাকবেন। বক্তব্যের শেষে তিনি সবাইকে কোদাল হাতে খাল খননে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

কর্মসংস্থান ও মাদকমুক্ত সমাজের প্রতিশ্রুতি
নেত্রকোণা ও শেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক সমস্যার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কর্মসংস্থান ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। তরুণদের কাজের সুযোগ তৈরি হলে তারা মাদক থেকে দূরে থাকবে। তিনি ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান।
নারী, কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্য পরিকল্পনা
তারেক রহমান বলেন, সরকার গঠন করতে পারলে নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড এবং সবার জন্য স্বাস্থ্য কার্ড চালু করা হবে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চান তিনি।

সমাবেশের সার্বিক চিত্র
সমাবেশে ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোণা ও শেরপুর জেলার নেতাকর্মীরা অংশ নেন। মঞ্চে তারেক রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান। ময়মনসিংহের কর্মসূচি শেষে তিনি পরবর্তী নির্বাচনি সমাবেশের জন্য গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হন।





সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















