আমেরিকার আধুনিক সনা সংস্কৃতি দেখে ইউরোপের অনেক মানুষই বিস্মিত। আলো ঝলমলে সাজ, হালকা গরম, নাচ, ডিজে আর মোবাইল ফোনে ব্যস্ত মানুষ—এই দৃশ্য তাদের কাছে সনা নয়, যেন অন্য কিছু। সহস্র বছরের পুরোনো এক নিরব, ধীর আর সামাজিক অভ্যাস কীভাবে পারফরম্যান্স আর প্রদর্শনের মঞ্চে রূপ নিচ্ছে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
নিউ ইয়র্কে প্রথম ধাক্কা
ফ্রান্স থেকে নিউইয়র্কে আসা সিসিল মেগুয়েরের সনা অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। সনায় ঢুকে তিনি দেখেন, এক তরুণী সাঁতারের পোশাকে যোগ ব্যায়ামের ভঙ্গিতে ব্যস্ত। তাঁর মনে হয়েছিল, যেন কেউ সনাকে গরম যোগা ক্লাস ভেবে নিয়েছে। পরে তিনি জানতে পারেন, কোথাও কোথাও সনায় নাচ হয়, কখনো ডিজেও থাকে। তাঁর কাছে বিষয়টি রীতিমতো অবাক করার মতো।

ফিনল্যান্ডের সনা মানে মিলনমেলা
ফিনল্যান্ডে বেড়ে ওঠা ইয়েরো কিলপির কাছে সনা মানে ছিল সামাজিক মিলনকেন্দ্র। পরিবার আর বন্ধুরা একসঙ্গে জড়ো হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সনায় থাকত। নগ্ন হয়ে ঘাম, নদীতে সাঁতার, কাঠে পোড়ানো সসেজ বা তাজা মাছ, খোলা বাতাসে বিশ্রাম—সব মিলিয়ে এক গভীর আর শান্ত অভিজ্ঞতা। তাঁর ভাষায়, কয়েক ঘণ্টার সনা আর ভালো খাবারের পর জীবন স্বর্গের মতো লাগে।
আমেরিকায় ফলাফল আর তাড়াহুড়া
কিন্তু আমেরিকায় এসে কিলপি দেখছেন ভিন্ন চিত্র। এখানে অনেকেই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে শরীরের প্রতিক্রিয়া মাপতে ব্যস্ত। কতক্ষণ ঘামল, হার্টবিট কত, শরীরে কী পরিবর্তন হলো—সবই যেন হিসাবের মধ্যে। তাঁর মনে হয়, মানুষ অনুভব করতে ভুলে যাচ্ছে। অনেকেই ব্যায়ামের আগে বা পরে কয়েক মিনিটের জন্য সনায় ঢুকে পড়ে, বিশ্রামের জন্য নয়। এতে সনার আসল আনন্দটাই হারিয়ে যাচ্ছে।

মোবাইল আর সেলফির দখল
মিনেসোটার জঙ্গলে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী স্লাভ ধাঁচের সনার মালিক ড্যানিয়েল বন্দরেঙ্কো বলছেন, সনায়ও এখন মোবাইল ফোন বড় বাধা। মানুষ ঘাম আর কথোপকথনে ডুবে না থেকে হৃদস্পন্দন মাপে, সেলফি তোলে, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেয়। এমনকি তাঁকে নিজের আত্মীয়কে সনায় ফোন ব্যবহার করতে মানা করতে হয়েছে। তাঁর মতে, প্রযুক্তি মানুষকে শরীরের অনুভূতি বোঝা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
সনা ব্রো সংস্কৃতি
ডুলুথের সনা উদ্যোক্তা মেগান ক্রেস এই প্রবণতাকে ডাকেন সনা ব্রো বলে। এটি কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের জন্য নয়। যারা ঠান্ডা পানিতে ঝাঁপ দিয়ে উল্লাস করে, আর্দ্রতার সময় মাপে, বা সনার বেঞ্চে বসে শরীরচর্চা করে—তাদেরই তিনি এই নামে চেনেন। তাঁর মতে, এভাবে সনা করার আসল উদ্দেশ্যটাই হারিয়ে যায়।
ইউরোপীয় রীতিতে পোশাক বড় প্রশ্ন
অস্ট্রিয়ার যোগ প্রশিক্ষক সুজানে ভেলেনহোফারের আপত্তি আরও পুরোনো। তিনি আটের দশকে আমেরিকায় এসে সনায় সাঁতারের পোশাক বা ব্যায়ামের পোশাক দেখে হতবাক হন। তাঁর কাছে এটি অগ্রহণযোগ্য। ইউরোপে পোশাক পরে সনায় ঢোকা অসম্মানের শামিল। তাই তিনি এখন বাড়িতেই সনা করেন।

সংস্কৃতির আয়নায় সনা
নরওয়েজিয়ান বংশোদ্ভূত আলোকচিত্রী মিকেল আয়ালান্ডের মতে, সনা সংস্কৃতি একটি সমাজের চরিত্র তুলে ধরে। প্রাচীন রোমে স্নানঘর ছিল অবসর আর আলাপের জায়গা। আর আমেরিকায় তা অনেক সময় চরম মাত্রার পারফরম্যান্সে পরিণত হয়। তাঁর কাছে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
সমালোচনার পাশাপাশি ধৈর্যের আহ্বান
তবে ইউরোপীয় কল্যাণ রিসোর্ট পরিচালনাকারী এক প্রতিষ্ঠানের মার্কিন প্রধান রবার্ট হ্যামন্ড মনে করেন, আমেরিকার সনা সংস্কৃতি এখনো শিশু পর্যায়ে। হাজার বছরের অভিজ্ঞ ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন। যদিও তিনি সনায় সুগন্ধি বা চিৎকার পছন্দ করেন না, তবু তাঁর মতে, ভুলভাবে হলেও সনা করা একেবারেই না করার চেয়ে ভালো। শেষ পর্যন্ত তাঁর মন্তব্য, আমেরিকানদের আসলে কিছু না করে বসে থাকতে শেখার জন্য ইউরোপীয়দের চেয়ে বেশি সহায়তা দরকার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















