শৈশবে শোনা এক ভীতিকর কিংবদন্তি বহু বছর পর কানাডার মঞ্চে রূপ নিল ব্যালে নাট্যে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ট্লামিন জনগোষ্ঠীর প্রবীণদের মুখে শোনা অরণ্যের এক রহস্যময় মানুষের গল্প নিয়ে কোরিওগ্রাফার ক্যামেরন ফ্রেজার মনরো নির্মাণ করেছেন ব্যালে ‘টেল’। এই কাজ শুধু শিল্পের পরীক্ষা নয়, কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে জাতীয় পুনর্মিলনের জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিও।
শৈশবের ভয় থেকে সৃজনের শুরু
ট্লামিন জনগোষ্ঠীর উত্তর সানশাইন কোস্টে বেড়ে ওঠা ক্যামেরনের শৈশব কেটেছে এক ভয়ের গল্প শুনে। বলা হতো, রাত নামলেই এক অশুভ বনমানুষ শিশুদের ধরে নিয়ে যায়। সেই স্মৃতিই দুই দশক পর তাঁর শিল্পীসত্তায় নতুন ভাষা পায়। এখন তিনি রয়্যাল উইনিপেগ ব্যালেতে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের আদিবাসী কোরিওগ্রাফারের কাজ হিসেবে ‘টেল’ মঞ্চস্থ করেছেন।
ব্যালে আর পুনর্মিলনের কঠিন পথ
কানাডার প্রাচীনতম পেশাদার ব্যালে প্রতিষ্ঠান রয়্যাল উইনিপেগ ব্যালে দীর্ঘদিন ধরেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অর্থবহ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে। ‘টেল’ সেই চেষ্টার ই অংশ। তবে এই পথ সহজ নয়। রাজনৈতিক পর্যায়ে পরিবর্তন ধীর, আর শিল্প প্রতিষ্ঠানে ও এসেছে ভেতরের টানাপোড়েন। গত বছর প্রতিষ্ঠানের আদিবাসী পরামর্শক গোষ্ঠীর সব সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, তাঁদের শুধু প্রদর্শনের অংশ বানানো হয়েছে, সিদ্ধান্তে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

নিজ ভূমিতে গল্পের প্রত্যাবর্তন
সব জটিলতার মধ্যেও ক্যামেরনের উৎসাহ কমেনি। দুই সপ্তাহের সফরে ব্যালেটি ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বিভিন্ন শহরে মঞ্চস্থ হচ্ছে। প্রথম প্রদর্শনী হচ্ছে পাওয়েল রিভারে, যা ট্লামিন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ভূমি। তাঁর খালা ও দিদিমারা দর্শকসারিতে থাকবেন। ক্যামেরনের ভাষায়, এই ব্যালে গল্পকে তার নিজের ঘরে ফিরিয়ে আনা। প্রবীণদের কাছে এটি স্বীকৃতির অনুভূতি, আর শিশুদের জন্য হয়তো জীবনের প্রথম ব্যালে দেখা।
মঞ্চের ভাষা ও সুরের মেলবন্ধন
‘টেল’ শুরু হয় অন্ধকারে। পাওও ড্রামের তালে তালে শোনা যায় মন্ত্রোচ্চারণ আর চেলোর সুর। সিডার রঙের পোশাকে নৃত্যশিল্পীরা সমবেত ভঙ্গিতে এগিয়ে যায়। সুর কখনো ধ্রুপদি, কখনো আধুনিক বৈদ্যুতিক ধ্বনিতে রূপ নেয়। সুরকার ক্রিস ডার্ক সেন আদিবাসী ছন্দ আর পাশ্চাত্য সঙ্গীতকে একসঙ্গে বুনেছেন।
ব্যালে কেন বেছে নেওয়া
ক্যামেরন নিজে আদিবাসী নৃত্যের নানা ধারায় প্রশিক্ষিত হলেও কোরিওগ্রাফার হিসেবে ব্যালেকেই বেছে নিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, ব্যালে পরিচিত ভাষা, যার মাধ্যমে পুরোনো গল্প নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছানো যায়। যদিও ব্যালে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ইতিহাসের অংশ, আর আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে তার দূরত্ব এখনো স্পষ্ট।
নৃত্যশিল্পী ও প্রতিনিধিত্বের সংকট
রয়্যাল উইনিপেগ ব্যালেতে কোনো আদিবাসী নৃত্যশিল্পী নেই, যদিও উইনিপেগ শহরেই কানাডার সবচেয়ে বড় নগর আদিবাসী জনসংখ্যা বাস করে। এই বাস্তবতায় ক্যামেরন আদিবাসী চরিত্রে অনাদিবাসী নৃত্যশিল্পী ব্যবহার করতে চাননি। তাই গল্পকে তিনি এক কাল্পনিক পাড়ায় স্থাপন করেছেন, যেখানে নৃত্যশিল্পীদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেই চরিত্র গড়ে ওঠে।

মৌখিক ইতিহাসের সম্মান
এই ব্যালেতে গল্প বলা হয়েছে মৌখিক ঐতিহ্যের মর্যাদা রেখে। ট্লামিন জনগোষ্ঠীর প্রবীণ জ্ঞান রক্ষক এলসি পল ব্যালের বর্ণনাকারী। তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় গল্পের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, সেই ভাষায়, যা একসময় আবাসিক বিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ ছিল। এই ব্যালেতেই প্রথমবার তিনি নিজের কণ্ঠে সেই ভাষা মঞ্চে শুনবেন।
শিল্পের সাফল্য ও প্রতিষ্ঠানের সংকট
‘টেল’ মঞ্চস্থ হওয়ার পর ক্যামেরনের জন্য খুলে যায় নতুন দরজা। নিউ ইয়র্কের একটি বড় উৎসবে কাজের আমন্ত্রণ পান তিনি। কিন্তু একই সময়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বাড়ে ক্ষোভ। পরামর্শক গোষ্ঠীর সদস্যরা বোর্ডে প্রতিনিধিত্ব না পাওয়ায় আস্থা হারান। নতুন শিল্পনির্দেশক নিয়োগে ও তাঁদের মতামত নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রতিরোধ আর স্থিতিস্থাপকতার ঘোষণা
সব বিতর্কের বাইরে ক্যামেরনের দৃষ্টি ভবিষ্যতের দিকে। সামনে আরও আদিবাসী ব্যালে মঞ্চস্থ করবেন তিনি। আপাতত তাঁর লক্ষ্য, নিজের জনগোষ্ঠীর সামনে সেই গল্প তুলে ধরা, যা তিনি শৈশবে শুনে বড় হয়েছেন। তাঁর কথায়, এই ব্যালে মঞ্চে তোলা নিজেই এক ধরনের প্রতিরোধ, আর নিজেদের অদম্য স্থিতিস্থাপকতার স্মরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















