স্কটল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে গ্রামীণ আয়ারশায়ারের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক প্রান্তরে অবস্থিত ডামফ্রিস হাউস আজ রাজা তৃতীয় চার্লসের দীর্ঘদিনের দর্শন ও কাজের জীবন্ত প্রতিফলন। দুই হাজার একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই ঐতিহাসিক এস্টেট রাজা প্রতিষ্ঠিত দাতব্য সংস্থা কিংস ফাউন্ডেশনের সদর দপ্তর। এখানেই বাস্তবে রূপ পেয়েছে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি, শিক্ষা ও টেকসই জীবনের ‘সামঞ্জস্য’ দর্শন, যা নিয়ে নির্মিত হয়েছে নতুন তথ্যচিত্র ‘ফাইন্ডিং হারমনি: আ কিংস ভিশন’।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নতুন সম্পর্ক
কিংস ফাউন্ডেশনের শিক্ষা কার্যক্রমের নির্বাহী পরিচালক সাইমন সাদিনস্কির ভাষায়, এই দর্শনের মূল কথা হলো মানুষ যেন নিজেকে প্রকৃতির থেকে আলাদা না ভাবে। ডামফ্রিস হাউসে সেই ভাবনাই হাতে-কলমে শেখানো হয়। শিশুদের শেখানো হচ্ছে খাদ্য অপচয় কমানো, গবাদিপশুর যত্ন নেওয়া ও পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজ। আবার বড় শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদে টেকসই বস্ত্র ও প্রাকৃতিক রং ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য এক ছাতার নিচে
ডামফ্রিজ হাউসের বাগান শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত। উদ্যানবিদ্যা বিভাগের প্রধান মেলিসা সিম্পসনের মতে, প্রতিটি ভবনের প্রয়োজনে গাছ লাগানো হয়। বস্ত্র কেন্দ্রে ব্যবহৃত রং আসে বাগানের উদ্ভিদ থেকে, রান্নাশালায় ব্যবহৃত ভেষজ ও সবজি তোলা হয় নিজস্ব জমি থেকে। পাশাপাশি রয়েছে ঔষধি উদ্ভিদে ভরা একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র।
বদলে যাওয়া শিক্ষার অভিজ্ঞতা
স্থানীয় আউচিনলেক এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এই এস্টেট নতুন এক শেখার জগৎ খুলে দিয়েছে। বিদ্যালয়ের উপপ্রধান পলিন রবার্টসনের মতে, শিশুরা এখন টেকসই জীবন ও পৃথিবীর যত্ন নিয়ে অনেক বেশি সচেতনভাবে কথা বলে। প্রকৃতি যেন তাদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে জীবন্ত শিক্ষক হয়ে উঠেছে।

কমিউনিটির প্রাণশক্তি ফেরানোর চেষ্টা
এক সময় শিল্পহীনতা ও বেকারত্বে জর্জরিত এই এলাকায় তরুণদের ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। সেই বাস্তবতা বদলাতেই কিংস ফাউন্ডেশনের কর্মসূচিতে গুরুত্ব পেয়েছে ঐতিহ্য ভিত্তিক পুনর্জাগরণ। কৃষি, সবুজ জ্বালানি ও আতিথেয়তা খাতে দক্ষতা গড়ে তুলে তরুণদের এলাকাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। সাদিনস্কির ভাষায়, এতে কমিউনিটির প্রাণশক্তি ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
ঝুঁকি থেকে সাফল্যের পথে
দুই হাজার সাত সালে জরাজীর্ণ ডামফ্রিস হাউস বিক্রির মুখে পড়লে তৎকালীন যুবরাজ চার্লস উদ্যোগ নিয়ে এটি কিনে নেন। সেই সিদ্ধান্ত তখন অনেকের চোখে ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় দুই দশক পর সেই ঝুঁকিই সাফল্যে রূপ নিয়েছে। এখন প্রতি বছর প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী এখানে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়, আর কিংস ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন মোট পনেরো হাজারের ও বেশি মানুষ।
বদলে যাওয়া জীবনের গল্প
এই এস্টেটের আতিথেয়তা প্রশিক্ষণ থেকে উঠে আসা স্টুয়ার্ট ব্যাংকস একসময় স্কুলছুট ছিলেন। আজ তিনি ডামফ্রিস হাউসে রাজা উপস্থিত থাকলে তাঁর ব্যক্তিগত সেবার দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাংকসের ভাষায়, এই জায়গাটিই তাকে জীবনের নতুন পথ দেখিয়েছে। কিংস ফাউন্ডেশন কোনো জাদুকাঠি নয়, তবে পিছিয়ে পড়া মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার সরঞ্জাম দিতে তারা আন্তরিক চেষ্টা করে।
তথ্যচিত্রে বিশ্বদরবারে ডামফ্রিস হাউস
এই সব কাজ ও দর্শনের গল্প নিয়েই তৈরি তথ্যচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে উইন্ডসর ক্যাসেলে রাজা চার্লসের উপস্থিতিতে। আগামী ছয় ফেব্রুয়ারি থেকে এটি বিশ্বজুড়ে প্রদর্শিত হবে, যেখানে ডামফ্রিস হাউস শুধু একটি এস্টেট নয়, বরং টেকসই ভবিষ্যতের এক বাস্তব মডেল হিসেবে উঠে আসবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















