বিশ্বজুড়ে নারীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হৃদরোগ হলেও এখনো বহু নারী মনে করেন ক্যানসারই তাঁদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। সমীক্ষা বলছে, স্তন ক্যানসারসহ বিভিন্ন ক্যানসারের তুলনায় হৃদরোগে নারীর মৃত্যু অনেক বেশি হলেও সচেতনতা রয়ে গেছে সীমিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে নারীর হৃদ স্বাস্থ্য অবহেলিত ও কম গবেষিত থাকাই এর বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নারীর ক্ষেত্রে হৃদ্রোগের লক্ষণ অনেক সময় পুরুষের মতো স্পষ্ট নয়। ফলে চিকিৎসকেরা সঠিকভাবে শনাক্ত করতে দেরি করেন, আবার অনেক নারী নিজেরা ও লক্ষণকে তুচ্ছ মনে করে উপেক্ষা করেন। অথচ সঠিক তথ্য ও সময়মতো পদক্ষেপ নিলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নারীর ঝুঁকি পুরুষের থেকে আলাদা
উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও পারিবারিক ইতিহাস নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে নারীদের জন্য ঝুঁকির তালিকা আরও দীর্ঘ। গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে ভোগা নারীদের পরবর্তী জীবনে হৃদ্সমস্যার আশঙ্কা বেশি থাকে। অনেক নারী বছর পেরিয়ে যাওয়ায় এসব তথ্য চিকিৎসককে জানান না, আবার অনেক সময় চিকিৎসকরাও জানতে চান না।
ডিম্বাশয়ের হরমোনজনিত জটিলতা, লুপাস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগ নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং এগুলো হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। পঁয়তাল্লিশ বছরের আগেই যাঁদের ঋতুবন্ধ হয়, তাঁদের ঝুঁকি আরও বেশি।

ঋতুবন্ধ ও হৃদ্স্বাস্থ্যের সংযোগ
ইস্ট্রোজেন হরমোন হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিকে সুরক্ষা দেয়। এ কারণেই নারীদের হৃদ্রোগ সাধারণত পুরুষদের তুলনায় প্রায় দশ বছর দেরিতে দেখা দেয়। কিন্তু ঋতুবন্ধের পর ইস্ট্রোজেন কমে গেলে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল বেড়ে যায় এবং ধমনির নমনীয়তা কমে আসে। অনেক নারী হঠাৎ কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ায় বিস্মিত হন, যদিও তাঁদের জীবনযাপন অপরিবর্তিত থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ ও ত্রিশের দশকে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নারীর হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে
বুকের তীব্র ব্যথা হৃদরোগের সাধারণ লক্ষণ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা অনেক সময় চাপ বা ভারী অনুভূতির মতো লাগে। পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, চোয়াল বা পিঠের ওপরের অংশে ব্যথা, ঠান্ডা ঘাম কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দেখা দিতে পারে। একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে হওয়ার প্রবণতাও নারীদের মধ্যে বেশি।
পারিবারিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে অনেক নারী নিজের উপসর্গকে গুরুত্ব দেন না। আগেও চিকিৎসকের কাছে অবহেলিত হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলে অনেকে আবার যেতে চান না।
হৃদ্ আক্রমণের কারণও আলাদা হতে পারে
পুরুষদের ক্ষেত্রে বড় ধমনিতে ব্লক তৈরি হয়ে হৃদ আক্রমণ বেশি ঘটে। নারীদের মধ্যেও এটি হয়, তবে অনেক নারীর হার্টে আক্রমন ঘটে ছোট রক্তনালীর সমস্যায় বা ধমনীতে হঠাৎ সংকোচনের কারণে। সন্তান প্রসবের পর ধমনির দেয়ালে ফাটল ধরার ঝুঁকি ও নারীদের মধ্যে বেশি, যা হৃদয় আক্রমণ ঘটাতে পারে। তীব্র মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় হওয়া ভাঙা হৃদযন্ত্র সিনড্রোম ও মূলত ঋতুবন্ধ-পরবর্তী নারীদের মধ্যে দেখা যায়।

পরীক্ষার ক্ষেত্রে ও দরকার বাড়তি সতর্কতা
সাধারণ কিছু পরীক্ষায় নারীদের হৃদ্আক্রমণ ধরা নাও পড়তে পারে। বড় ধমনিতে সমস্যা না থাকলে অনেক সময় এনজিওগ্রাম স্বাভাবিক দেখায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি বিভাগে এমন অভিজ্ঞতার পর অবশ্যই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। উন্নত স্ক্যান ও কার্যকারিতা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত সমস্যা ধরা পড়তে পারে।
গবেষণার বড় ঘাটতি এখনো
দশকের পর দশক চিকিৎসা গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণ কম ছিল। ফলে ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা নির্দেশনা মূলত পুরুষদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। এমনকি অনেক স্টেন্টও পুরুষদের ধমনির মাপ অনুযায়ী তৈরি, যা নারীদের ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়াতে পারে।
চিকিৎসকের দৃষ্টিভঙ্গিও প্রভাব ফেলে
অনেক নারী প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের ওষুধ দেরিতে শুরু করেন। সন্তান ধারণের সম্ভাবনার কথা ভেবে চিকিৎসকেরাও কখনো দ্বিধায় পড়েন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরামর্শে এসব ওষুধ নিরাপদ ভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। একই সঙ্গে নারীদের ওজন বা জীবনযাপন নিয়ে বিচার করার মানসিকতা চিকিৎসা ব্যবস্থা কে বদলাতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















