দুবাই মেরিনার আকাশরেখার একাত্তর তলা ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মুহূর্তে সহজেই মন হারিয়ে যায়। আর সেই সঙ্গে যদি সামনে বসে থাকেন বিনোদন জগতের অন্যতম আলোচিত মুখ জেসন মোমোয়া, তাহলে অভিজ্ঞতাটা আরও গভীর হয়। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু হোটেল সিয়েল দুবাই মেরিনার একটি কক্ষে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন তিনি। চোখে হালকা রঙের চশমা, মাথায় টুপি। পেছনে বিস্তৃত দুবাই হারবার, খোলা সমুদ্র আর সিনেমার পর্দা ছাড়িয়ে যাওয়া দৃশ্য। অথচ পরিবেশ যতই নাটকীয় হোক, মোমোয়ার আচরণ শান্ত, স্থির এবং অবলীলায় নিজের কনুইয়ে বরফ চেপে ধরছেন।
সুস্থ আছেন কি না জানতে চাইলে হেসে বিষয়টা উড়িয়ে দেন। জানালেন, সম্প্রতি অস্ত্রোপচার হয়েছে। এই সফরে দুবাইয়ে আসার কারণ একাধিক, তবে মূলত নিজের পানীয় ব্র্যান্ডের প্রচারই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
কথোপকথন শুরুর আগেই ছোট একটি ঘটনা পুরো পরিবেশটাকে বদলে দেয়। প্রতিবেদকের ফোনের পর্দায় লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর একটি দৃশ্য চোখে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে ছবিটির নাম উচ্চারণ করে হেসে ওঠেন মোমোয়া। সেই মুহূর্তেই বোঝা যায়, এটা কোনো গম্ভীর তারকা সাক্ষাৎকার হতে যাচ্ছে না।
বিশৃঙ্খলার মধ্যেও স্থির থাকা
কথা ঘুরে যায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামলানোর প্রসঙ্গে। নিজের নামে কোনো বিশেষ পদ্ধতির কথা শুনে মোমোয়া উল্টো বড় ছবিটা দেখতে চান। কোথায় বিশৃঙ্খলা, সেটাই তাঁর কাছে আগে গুরুত্বপূর্ণ। পানি, রাস্তা কিংবা হোটেল—পরিস্থিতি বুঝে তবেই পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষপাতী তিনি। শুটিং সেটে ঝামেলা হলে বিচারক হওয়ার চেয়ে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাঁর অগ্রাধিকার।
তিনি জানান, মানুষ যখন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তখন তিনি বরং ধীরে চলেন। ছোটবেলায় লাইফগার্ড হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই এই অভ্যাস। ভূমিকম্পের মতো পরিস্থিতিতে কীভাবে বের হওয়া যায়, কার আগে সাহায্য দরকার—এই বিশ্লেষণটা তাঁর কাছে প্রথম।
সবচেয়ে আগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর নীতি। পর্দায় তাঁকে প্রায়ই যোদ্ধা বা অতিমানব হিসেবে দেখা যায়, বাস্তবে তাঁর ভাবনাটা ভীষণ মানবিক।
সিনেমা আর পর্দার দর্শন
আলোচনা যখন চলচ্চিত্র আর ধারাবাহিকের দিকে যায়, তখন মোমোয়া আরও মনোযোগী হয়ে ওঠেন। তাঁর মতে, সব ছবি এক নয়। কিছু ছবি শুধু বিনোদন, আর কিছু সত্যিকারের সিনেমা। গল্প আর পরিচালনাই সিনেমার প্রাণ, আর সেই কারণেই তাঁর কাছে ডিউন আলাদা গুরুত্ব পায়। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী কে যে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেটাকে তিনি ব্যতিক্রমী বলেই মনে করেন।
অন্যদিকে ধারাবাহিকের জগৎ আলাদা সুযোগ দেয়। দুই ঘণ্টার বদলে বহু ঘণ্টা ধরে একই চরিত্রে বেঁচে থাকার সুযোগ থাকে, যা বড় পর্দায় সম্ভব নয়। তবে সবচেয়ে ভয়ের জায়গা তাঁর নিজের চরিত্রে থাকা। নিজের পছন্দের কাজগুলো নিয়ে করা অনুষ্ঠানগুলোতে তিনি কোনো চরিত্র নন, শুধুই নিজে—এই সত্যটাই তাঁকে বেশি নার্ভাস করে।
কোন গল্প কোথায় মানানসই, সেটাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিছু গল্প ধারাবাহিক না হলে পূর্ণতা পায় না, আবার কিছু গল্প কেবল সিনেমার জন্যই তৈরি।
বন্ধুত্ব আর নতুন সমীকরণ
ডেভ বাতিস্তার সঙ্গে নতুন ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেন মোমোয়া। আগে যেখানে দুজনকে শত্রু চরিত্রে দেখা গেছে, এবার সেখানে ভাইয়ের ভূমিকায়। কাদা আর রক্তে মাখামাখি যুদ্ধের বদলে আধুনিক সময়ের গল্প, হাস্যরস আর ভিন্ন আবহ—এই পরিবর্তনটাই তাঁদের কাছে আকর্ষণীয়।
দুবাইয়ের দৃশ্য আর মানুষের টান
সন্ধ্যায় এক বিশেষ অনুষ্ঠানে নিজেই বারের পেছনে দাঁড়ান মোমোয়া। চারপাশের পরিবেশ তাঁকে মুগ্ধ করে। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু হোটেলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, কিংবা পাম জুমেইরার দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য—সবই তাঁর কাছে স্মরণীয়।
দুবাই তাঁকে অভিভূত করে কি না জানতে চাইলে স্বীকার করেন, শহরটা মাঝে মাঝে বেশ উন্মাদ। তবে যেকোনো শহরে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বিষয় মানুষ আর প্রকৃতি। আকাশে ঝাঁপ দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আপাতত সেটা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বেশি যা চান, তা হলো নৌকায় চড়ে সমুদ্র থেকে শহরটাকে দেখা।
পানির প্রতি এই টান দেখেই মনে হয়, আটলান্টিসের রাজা চরিত্রটা হয়তো তাঁর সঙ্গেই মানানসই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















