চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বেইজিং সফরে গিয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের অর্থনৈতিক সুফলের কথা জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। পশ্চিমা বিশ্ব যখন ট্রাম্পের অনিশ্চিত অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন স্টারমারই সর্বশেষ নেতা হিসেবে চীনের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক তৎপরতায় নামলেন।
স্টারমার-শি বৈঠক ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের বার্তা
বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকে স্টারমার ‘আরও পরিণত ও বাস্তবসম্মত সম্পর্ক’-এর আহ্বান জানান। তিনি বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, শুল্ক কমানো ও বিনিয়োগ চুক্তির ওপর জোর দেন। আলোচনায় অর্থনীতি ছাড়াও ফুটবল ও শেক্সপিয়ারের মতো সাংস্কৃতিক বিষয় উঠে আসে। ২০১৮ সালের পর স্টারমারই প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চীন সফরে গেলেন।

ট্রাম্পের সতর্কবার্তা
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়ানো যুক্তরাজ্যের জন্য ‘খুবই বিপজ্জনক’। তিনি এই মন্তব্য করেন কেনেডি সেন্টারে ‘মেলানিয়া’ চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ারের আগে। তবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। উল্লেখযোগ্যভাবে, ট্রাম্প নিজেও আগামী এপ্রিলে চীন সফরের পরিকল্পনা করছেন। এর আগে কানাডা চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক চুক্তি করায় ট্রাম্প শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
বেইজিংয়ে স্টারমারের আশাবাদ
ট্রাম্পের মন্তব্যের কাছাকাছি সময়ে বেইজিংয়ে ইউকে-চায়না বিজনেস ফোরামে স্টারমার বলেন, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার ‘খুব উষ্ণ’ বৈঠক প্রত্যাশিত মাত্রার সম্পৃক্ততা এনে দিয়েছে। তার ভাষায়, যুক্তরাজ্যের দেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে এবং বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে। ভিসামুক্ত ভ্রমণ ও হুইস্কির ওপর শুল্ক কমানোর মতো চুক্তিকে তিনি সম্পর্ক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। স্টারমারের মতে, এভাবেই পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান গড়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য
কেন্দ্র-বাম লেবার সরকারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চাপে থাকা স্টারমার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, যুক্তরাজ্যকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে না। বিমানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও বাণিজ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্পের যুক্তরাজ্য সফরে দেশটিতে ১৫০ বিলিয়ন পাউন্ড মার্কিন বিনিয়োগের ঘোষণা আসে।
ট্রাম্পের সঙ্গে মতপার্থক্য
সাধারণত ট্রাম্পের সমালোচনা এড়িয়ে চললেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে স্টারমার কিছু বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। ন্যাটো বাহিনী নিয়ে ট্রাম্পের ‘অগ্রহণযোগ্য’ মন্তব্যের জন্য তিনি ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান এবং গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবিতেও সায় দেননি।

কঠিন রপ্তানি বাস্তবতা ও পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া
চীনে প্রবেশকে কঠিন বাজার হিসেবে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক। তার মতে, চীনে রপ্তানি করা অত্যন্ত কঠিন এবং ব্রিটেনের প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাজ্য যদি প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান না নেয়, তাহলে কানাডার মতো শুল্ক হুমকির মুখে পড়বে না।
এদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর চীন সফরের পর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসেরও শিগগির বেইজিং যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে নতুন করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















