সরকার যে সংস্কার বাস্তবায়নের আন্তরিক উদ্দেশ্য নিয়ে গণভোট আয়োজন করছে, তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। তাঁর মতে, এই গণভোট মূলত সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও তাঁর সহযোগীদের সন্তুষ্ট করার একটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে।
সংস্কার নিয়ে জনসচেতনতার ঘাটতি
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক আলোচনায় রেহমান সোবহান বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে কার্যত কোনো সচেতনতা নেই। পুরো প্রক্রিয়াটিকে তিনি অস্বচ্ছ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, সংস্কারকে ঘিরে এক ধরনের কল্পিত বাস্তবতা তৈরি করা হয়েছে, যেটিকে সরকার গণভোটের মাধ্যমে বৈধতা দিতে চাইছে।
হ্যাঁ না প্রশ্নে জটিল সংস্কার অগ্রহণযোগ্য
রেহমান সোবহানের মতে, ৩৮টি জটিল সংস্কার প্রস্তাব সম্পর্কে জনগণের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলেও কেবল হ্যাঁ অথবা না ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে পুরো উদ্যোগটিই গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক জোটকেই তিনি দেখেননি জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট করে বলতে যে এই ৩৮টি সংস্কার কেন গণতন্ত্রের নতুন রূপ দেওয়ার জন্য জরুরি এবং কেন এ বিষয়ে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সংস্কার দাবি সরকারের ভ্রান্ত বয়ান
সরকারের সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, মাত্র ১৮ মাস দায়িত্বে থাকা কোনো অন্তর্বর্তী সরকার প্রকৃত সংস্কার বাস্তবায়নের অবস্থানে থাকে না। কারণ সংস্কার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যার মধ্যে আইন প্রণয়ন, সংসদে আলোচনা এবং নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন জড়িত।
তিনি বলেন, সংস্কার কেবল লিখে ফেললেই হয় না। তা কার্যকর করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি সরকার প্রয়োজন, যারা সংসদের মাধ্যমে আইন করে বাস্তবায়ন করবে।

হ্যাঁ ভোটের প্রচারণা নিয়ে সমালোচনা
সরকারের হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণাকেও তিনি গুরুত্বহীন বলে আখ্যা দেন। তাঁর অভিযোগ, সীমিতসংখ্যক ব্যাংক কর্মকর্তা, কিছু এনজিও কর্মী এবং কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দিয়ে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত
রেহমান সোবহান মনে করেন, এই গণভোটের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য রাজনৈতিক। তাঁর সন্দেহ, অধ্যাপক ইউনূস মাহফুজ আলমকে সন্তুষ্ট করতেই এই আয়োজন করছেন, কারণ মাহফুজ ও তাঁর সহযোগীরা চাইছেন যেন আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া না হয়। ফলে একটি বাহ্যিক বা সৌন্দর্যবর্ধক ব্যবস্থা দেখানো হচ্ছে, যাতে মনে হয় কিছু একটা করা হয়েছে।
সংস্কার কখন বাস্তবে কার্যকর হয়
তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রকৃত সংস্কার তখনই হয়, যখন পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকে এবং সেই সরকার সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা দেখায়। তখনই সংস্কারের গুণগত মান ও আন্তরিকতা মূল্যায়ন করা সম্ভব।
নির্বাচনের দিনই গণভোট
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ভোটারদের সামনে চারটি বিষয়ের একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হবে, যেখানে আলাদা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। পুরো বিষয়েই কেবল হ্যাঁ অথবা না ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এই আলোচনায় সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাওমি হোসেনও অংশ নেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















