মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও গণতন্ত্রের দাবিতে রাস্তায় নামা তরুণদের দমন-পীড়ন থামেনি। কারাগারে আটক তরুণ রাজনৈতিক বন্দিদের একটি বড় অংশ নির্যাতন, চিকিৎসার অভাব ও রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মৃত্যুবরণ করেছেন। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এই প্রজন্মটি হয়ে উঠেছে এক ‘হারানো প্রজন্ম’।
প্রজন্মের স্বপ্ন ও ভাঙন
২০১৯ সালে ইয়াঙ্গুন শহরের ডাগন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে শ্বে থেইঙ্গি ও উত ইয়ি আউংয়ের। একই সময়ে অন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের ছাত্র খান্ত লিন নাইংও ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তারা সবাই সেই প্রজন্মের অংশ, যারা দীর্ঘদিন পর আধা-গণতান্ত্রিক পরিবেশে বড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান সেই স্বপ্ন চূর্ণ করে দেয়।
অভ্যুত্থানের পর হাজার হাজার তরুণ গণতন্ত্রের পক্ষে রাজপথে নামেন। কেউ কেউ সশস্ত্র প্রতিরোধে যান, কেউ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, আবার অনেকে কারাগারে আটক হন। সেখানেই শুরু হয় ভয়াবহ মানবাধিকার সংকট।

কারাগারে মৃত্যুর ভয়াবহ চিত্র
রাজনৈতিক বন্দিদের নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, অভ্যুত্থানের পর থেকে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অন্তত ৭৪ জন তরুণ রাজনৈতিক বন্দি কারাগারে মারা গেছেন। রাষ্ট্রদ্রোহ ও উসকানির অভিযোগে আটক মোট বন্দিদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি। এসব তথ্য জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও উদ্ধৃত করেছে।
কারাগারে নির্যাতন, চিকিৎসার অভাব ও অমানবিক অবস্থার অভিযোগ বহুদিনের। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা আগেই বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচালিত আটককেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত নির্যাতন ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। তবে সামরিক সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
উত ইয়ি আউংয়ের করুণ পরিণতি
অভ্যুত্থানের পর শ্বে থেইঙ্গি ইয়াঙ্গুন ছেড়ে চলে গেলেও উত ইয়ি আউং থেকে যান এবং প্রতিরোধ আন্দোলনে যুক্ত থাকেন। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রদ্রোহ ও উসকানির অভিযোগে সাত বছরের সাজা দিয়ে ইয়াঙ্গুনের কুখ্যাত ইনসেইন কারাগার-এ পাঠানো হয়।

কারাগার থেকে লেখা চিঠিতে তিনি পরিবারের কাছে ওষুধ ও খাবারের জন্য অর্থ পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে বলে সহপাঠী ও ছাত্র ইউনিয়নের দাবি। কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় তার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই, মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি কারাগারেই মারা যান। কর্তৃপক্ষ মৃত্যুর কারণ হৃদ্রোগ বলে জানালেও সহপাঠী ও সংগঠনগুলো তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
খান্ত লিন নাইংয়ের রহস্যময় মৃত্যু
১৯ বছর বয়সে গ্রেপ্তার হওয়া খান্ত লিন নাইংকে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে উসকানির অভিযোগে ১৫ বছরের সাজা দেওয়া হয়। ইয়াঙ্গুন থেকে দূরের দাইক-উ কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে পরিবার জানতে পারে, কারাগার বদলির সময় পালানোর চেষ্টায় গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন।
কিন্তু পরিবার তার মরদেহ দেখার সুযোগ পায়নি। দুই বছর পরও তারা জানাজা করতে পারেনি। বন্দি পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর দাবি, বন্দিদের কড়া পাহারায় স্থানান্তর করা হয়, তাই পালানোর চেষ্টা সংক্রান্ত ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাদের মতে, মৃত্যুর আগে তাকে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়েছিল।

হারানো প্রজন্মের বাস্তবতা
জাতিসংঘের হিসাবে, অভ্যুত্থানের পর প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ তরুণ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। গ্রেপ্তার, নির্যাতন, জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ ও বাস্তুচ্যুতি—সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে তরুণ প্রজন্মের ওপর।
এশিয়ার অন্য দেশে তরুণদের আন্দোলনে সরকার পতন ঘটলেও মিয়ানমার-এ সামরিক জান্তা এখনো টিকে আছে। সীমান্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারালেও তারা বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ও আকাশপথে হামলা বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়ও সেনাসমর্থিত শক্তির ক্ষমতায় থাকার ইঙ্গিত মিলছে।
অসমাপ্ত স্বপ্ন
উত ইয়ি আউং স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ আরও বাড়াতে চেয়েছিলেন, আর শ্বে থেইঙ্গির স্বপ্ন ছিল সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার। খান্ত লিন নাইংয়েরও ছিল নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার আশা। কিন্তু দমন-পীড়নের রাজনীতিতে সেই স্বপ্নগুলো থেমে গেছে কারাগারের অন্ধকারে।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















