২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট ভারতের অর্থনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। কল্যাণ, প্রণোদনা কিংবা কেবলমাত্র প্রবৃদ্ধির চেয়ে প্রতিযোগিতাশীলতাকে প্রধান দায়িত্ব হিসেবে সামনে এনেছে এই বাজেট। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে যে বৈশ্বিকভাবে ভাঙাচোরা অর্থনৈতিক বাস্তবতায় টিকে থাকার প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন প্রতিযোগিতায় সক্ষম থাকা।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ভারতের অবস্থান
বর্তমান বিশ্বে বাণিজ্য আর শুধু দক্ষতার ওপর নির্ভর করছে না। ভূরাজনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন এবং অনিশ্চিত পুঁজিপ্রবাহ অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত প্রবেশ করছে শক্ত ভিত নিয়ে। প্রায় সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, সুস্থ ব্যাংকিং খাত এবং জিডিপির ৪ দশমিক ৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাজস্ব ঘাটতি ভারতের বড় শক্তি। গত এক দশকে সরকারি মূলধনী ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং ঋণমানও উন্নত হয়েছে। তবু আন্তর্জাতিক পুঁজি এখনও সতর্ক, মুদ্রা রুপি চাপের মুখে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা যেমন বলছে, বৈশ্বিক বাজারে ভারত নিজের সক্ষমতার তুলনায় কম প্রভাব ফেলছে।

কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন
ভারত স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির সময়ে চলতি হিসাবে ঘাটতি বহন করে এবং বিনিয়োগের জন্য বিদেশি পুঁজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক পুঁজিপ্রবাহে সামান্য পরিবর্তনও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। পরিষেবা রপ্তানি, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক পরিষেবা, এখনো বড় ভরসা হলেও দীর্ঘমেয়াদে শুধু পরিষেবা খাত দিয়ে বৈদেশিক স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় প্রতিযোগিতাশীলতা ভারতের জন্য বাধ্যতামূলক শর্তে পরিণত হয়েছে।
প্রতিযোগিতার প্রথম দিকনির্দেশ: সুরক্ষা নয়, উৎপাদন ব্যবস্থা
বাজেটের প্রথম দিকনির্দেশ হলো সুরক্ষাবাদ নয়, বরং শক্তিশালী উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা গড়ে তোলা। কৌশলগত ও আধুনিক খাতে উৎপাদন বাড়ানো, পুরোনো শিল্পগুচ্ছ পুনরুজ্জীবন এবং সক্ষম ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বায়োফার্মা, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, মূলধনী পণ্য ও বিরল খনিজ খাতে নিয়ন্ত্রক গতি, পরীক্ষাগার অবকাঠামো, নকশা সক্ষমতা ও সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বায়োফার্মা শক্তি কর্মসূচিতে উৎপাদনের পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো উন্নয়নের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে পুঁজির উচ্চ ব্যয়, যার সমাধানে নতুন তহবিল ও আর্থিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় দিকনির্দেশ: সামগ্রিক দক্ষতা ও অবকাঠামো
বাজেটের দ্বিতীয় মূল দিকনির্দেশ হলো অর্থনীতির সামগ্রিক দক্ষতা বাড়ানো। অবকাঠামো, জ্বালানি ও নগর ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মালবাহী করিডর, নৌপথ, সম্পদ পুনর্ব্যবহার এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণকে শিল্প প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। নগর অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, কারণ উৎপাদনশীলতার বড় অংশ এখন শহরকেন্দ্রিক এবং সেখানে প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব বড় বাধা।
শুল্কনীতি ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
এই বাজেটে শুল্কনির্ভর সুরক্ষাবাদ থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকা হয়েছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষার সতর্কবার্তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত সুরক্ষা অনেক সময় রপ্তানিকারকদের ওপর করের মতো চাপ তৈরি করে। তাই রাষ্ট্র নিজেকে নিয়ন্ত্রণকারী নয়, বরং আকার, গতি ও শৃঙ্খলা তৈরির সহায়ক হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
জ্বালানি ও জলবায়ু কৌশল

জ্বালানি ও জলবায়ু প্রশ্নে বাজেটের দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট। জলবায়ু নীতিকে আলাদা কোনো লক্ষ্য হিসেবে নয়, শিল্প ও প্রযুক্তিগত কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। কার্বন মূল্য, সীমান্ত কর এবং সবুজ ক্রয়নীতির কারণে উৎপাদন ব্যয় কাঠামো বদলে যাচ্ছে। তাই কার্বননির্ভর শিল্পে প্রতিযোগিতা নির্ভর করবে জ্বালানি ব্যবস্থা ও নির্গমন দক্ষতার ওপর। একই সঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে যে ভুলভাবে পরিকল্পিত রূপান্তর জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়ে শিল্পভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। এজন্য জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্য স্থিতিশীলতাকে প্রতিযোগিতার কাঠামোর মধ্যেই রাখা হয়েছে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও রাষ্ট্রক্ষমতা
বাজেটের এই প্রতিযোগিতা কর্মসূচি সফল করতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যগুলোর ব্যয় অগ্রাধিকার, বিশেষ করে রাজস্ব ব্যয় ও মূলধনী ব্যয়ের ভারসাম্য, বিনিয়োগ পরিবেশকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি কিংবা নগর উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই সময়নিষ্ঠা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতা অপরিহার্য।
এই বাজেটে প্রতিযোগিতাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখানো হয়েছে ফলাফলের দাবি হিসেবে নয়, বরং আত্মশক্তি বৃদ্ধির একটি শৃঙ্খলা হিসেবে। অস্থির পুঁজি, বিভক্ত বাণিজ্য ও অনিশ্চয়তায় ভরা বিশ্বে আগেভাগে স্থিতিশীলতা গড়ে তোলার আহ্বানই এর মূল বার্তা। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের বদলে উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে ব্যয় কমানো, বৈচিত্র্যের মাধ্যমে সুরক্ষা তৈরি এবং ধারাবাহিকতার মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি কতটা টেকসই প্রতিযোগিতায় রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে নীতিমালা, প্রতিষ্ঠান ও প্রণোদনার দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ের ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















