নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রস্তাবিত জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন ও সম্প্রচার কমিশন গঠনের খসড়া অধ্যাদেশ হঠাৎ প্রকাশ এবং মাত্র তিন দিনের জনমত গ্রহণের সময়সীমা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইনটিন। সংস্থাটি বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ মুহূর্তে নেওয়া এই উদ্যোগে স্বচ্ছতা ও যথাযথ প্রক্রিয়ার ঘাটতি রয়েছে, যা বাংলাদেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন নির্বাচিত সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে আর্টিকেল নাইনটিন স্পষ্টভাবে আহ্বান জানিয়েছে—এই খসড়া অধ্যাদেশ কার্যকর করার প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত রেখে সিদ্ধান্তটি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। সংস্থাটি মনে করে, এত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নতুন গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক পরামর্শের দাবি
গণমাধ্যম সংস্কারের যেকোনো উদ্যোগে সাংবাদিক, সম্পাদক, নাগরিক সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের যেকোনো গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণমুক্ত, পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করার দাবি জানানো হয়েছে। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের আইনগত স্বীকৃতি, সমান সুরক্ষা এবং নির্বাচনী সময়ে সকল সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

খসড়া অধ্যাদেশ নিয়ে উদ্বেগ
প্রস্তাবিত জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন কাঠামো, দায়িত্ব, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রভাব রাখার ঝুঁকি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে আর্টিকেল নাইনটিন। এতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্য দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের আলোকে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা অপরিহার্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া খসড়ায় ‘সাংবাদিক’ সংজ্ঞা থেকে ফ্রিল্যান্স কর্মীদের বাদ দেওয়ার বিষয়টিকে গুরুতর ত্রুটি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি। এতে গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ আইনি সুরক্ষা, স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে, যা বিদ্যমান নাজুক গণমাধ্যম পরিবেশকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
সম্প্রচার কমিশন নিয়েও একই প্রশ্ন
প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশে ও একই ধরনের কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। জনস্বার্থ ভিত্তিক সাংবাদিকতা বা মতের বহুত্ব রক্ষার বদলে এই কাঠামো নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

বিলম্বের পর হঠাৎ তৎপরতা
বাংলাদেশ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ জমা পড়ার প্রায় এক বছর পর হঠাৎ এই তাড়াহুড়ো কেন—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আর্টিকেল নাইনটিন। দীর্ঘ সময় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার পর হঠাৎ দ্রুততার সঙ্গে অধ্যাদেশ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া উদ্দেশ্য ও বৈধতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম সম্প্রদায়ের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সংস্থাটি বলেছে, গণমাধ্যম সংস্কারের প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















