ভারতে বন্ধ্যাত্বকে দীর্ঘদিন ধরে কেবল শারীরিক সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণা দেখাচ্ছে—মানসিক স্বাস্থ্য প্রজনন সক্ষমতার একটি কেন্দ্রীয় নির্ধারক। উদ্বেগ, হতাশা ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শুধু আবেগগত কষ্টই বাড়ায় না, বরং গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমিয়ে দেয়। ফলে বিজ্ঞান যা জানে এবং সমাজ যা বিশ্বাস করে—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
নারীর ওপর সামাজিক চাপ ও লিঙ্গ বৈষম্য
ভারতীয় সমাজে মাতৃত্বকে নারীত্বের প্রধান পরিচয় হিসেবে দেখার প্রবণতা এখনো প্রবল। সন্তান না থাকলে নারীদের সামাজিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় আয়োজন কিংবা পারিবারিক পরিসর থেকে দূরে রাখা হয়, যা তাদের মধ্যে লজ্জা, বিচ্ছিন্নতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করে।
জৈবিকভাবে সন্তান ধারণে নারী-পুরুষ উভয়ের ভূমিকা থাকলেও দায় প্রায় সম্পূর্ণভাবে নারীর ওপর চাপানো হয়। এমনকি পুরুষের শারীরিক সমস্যাও শনাক্ত হলে সামাজিক দোষারোপ নারীকেই ঘিরে থাকে—যা গভীর লিঙ্গ বৈষম্যের প্রতিফলন।

পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রজনন সক্ষমতা
গবেষণা বলছে, পুরুষের মানসিক চাপ, হতাশা ও উদ্বেগ সরাসরি শুক্রাণুর গুণগত মান কমিয়ে দিতে পারে। হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, কর্টিসল বৃদ্ধি এবং কোষীয় বিপাক প্রক্রিয়ার ব্যাঘাত—এসবই প্রজনন সক্ষমতা হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত।
তবুও সামাজিক কাঠামো পুরুষদের মানসিক কষ্টকে আড়াল করে রাখে। ফলে নারীরা সামাজিক দোষ বহন করলেও অচিকিৎসিত মানসিক সমস্যার কারণে পুরুষদের জৈবিক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এটি একটি গভীর বৈপরীত্য তৈরি করে।
নারীর মানসিক চাপ ও গর্ভধারণের সম্ভাবনা
উচ্চ মানসিক চাপ নারীর গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমিয়ে দেয়—এমন প্রমাণ বহু গবেষণায় পাওয়া গেছে। মানসিক চাপের জৈবিক সূচক বৃদ্ধি পেলে প্রতিটি মাসিক চক্রে গর্ভধারণের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
অর্থাৎ সামাজিক চাপ শুধু আবেগগত কষ্ট নয়, শারীরবৃত্তীয় প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করে। এতে একটি চক্র তৈরি হয়—সামাজিক দোষারোপ মানসিক চাপ বাড়ায়, আর সেই চাপ আবার প্রজনন ক্ষমতা কমায়।

চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মানসিক ও সম্পর্কগত প্রভাব
আইভিএফসহ সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তির সাফল্যও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। উদ্বেগ ও হতাশা বাড়লে চিকিৎসার সফলতার হার কমে যায়।
চিকিৎসার সময় দাম্পত্য সম্পর্কেও পরিবর্তন আসে। স্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা অনেক সময় চিকিৎসা সূচি ও শারীরিক চাপের কারণে যান্ত্রিক হয়ে পড়ে, যা সম্পর্কের আবেগিক দূরত্ব বাড়াতে পারে।
সামনে এগোনোর পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন—নারীত্বকে মাতৃত্বের সঙ্গে একীভূত করে দেখার ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। একই সঙ্গে পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে।
প্রজনন চিকিৎসায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাধ্যতামূলক অংশ হিসেবে যুক্ত করা, উদ্বেগ-হতাশা নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং দম্পতির সম্পর্কগত সহায়তা নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপ নিলে চিকিৎসা ফলাফল যেমন উন্নত হবে, তেমনি মানবিক মর্যাদাও রক্ষা পাবে।
অবশেষে, কলঙ্কের বদলে বিজ্ঞান, নীরবতার বদলে সংলাপ এবং দোষারোপের বদলে সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করলেই ভারতে প্রজনন চিকিৎসা সত্যিকারের মর্যাদা ও সমতার পথে এগোতে পারবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















