ইতালি শীতকালীন অলিম্পিকের জন্য প্রস্তুত। শুক্রবার মিলানো কোর্তিনা অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইতালির ইতিহাস, শিল্প ও ফ্যাশনের এক রঙিন উদযাপন দেখেছে বিশ্ব। তবে জাঁকজমকপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায়। মিলানের সান সিরো স্টেডিয়ামে প্রধান অনুষ্ঠানে ইতালীয় প্রেসিডেন্ট সের্জিও ম্যাতারেলা আনুষ্ঠানিকভাবে গেমসের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই শোতে ৪০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে ডলোমাইটস পর্বতমালায় অবস্থিত সহ-আয়োজক শহর কোর্তিনা দ’আমপেজ্জোর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হয়। দুই শহরে একই সময়ে দুটি অলিম্পিক মশাল জ্বালানো হয়েছে, যা ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জ্বলতে থাকবে।
রাজনীতির ছায়া, ঐক্যের আহ্বান
বিখ্যাত ফুটবল স্টেডিয়ামে “আর্মোনিয়া” (সামঞ্জস্য) শিরোনামের সাড়ে তিন ঘণ্টার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ইউরোপের তীব্র সমালোচক ভ্যান্সকে নিয়ে উত্তেজনা দেখা যায় স্টেডিয়ামে। বড় পর্দায় মার্কিন পতাকা হাতে তার ছবি ভেসে উঠলে দর্শকদের কাছ থেকে শোনা যায় তিরস্কারের শব্দ। ইসরায়েলি দলের ঘোষণায় মিলানে বুইং শোনা গেলেও কোর্তিনায় ছিল করতালি। ইতালিতে ইসরায়েলের ১০ সদস্যের দল রয়েছে। অপরদিকে, মিলানে ইউক্রেনের পাঁচ ক্রীড়াবিদের দল বিপুল করতালি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সভাপতি কার্স্টি কভেন্ট্রি বলেন, গেমস মানুষকে একত্রিত করবে। “এই গেমস যেন হয় আমাদের ঐক্যের উদযাপন – যা কিছু আমাদের মানবিক করে তোলে তার উদযাপন। অলিম্পিক গেমসের এটাই জাদু: আমাদের সবাইকে একসঙ্গে সেরা হতে অনুপ্রাণিত করা,” তিনি যোগ করেন।
প্রথমবারের মতো দুটি অলিম্পিক মশাল একযোগে জ্বালানো হয়। মিলানের ঊনবিংশ শতাব্দীর স্থাপনা আর্কো দেল্লা পাচে (শান্তি খিলান) এবং কোর্তিনার পিয়াজ্জা দিবোনায় জ্বলছে এই মশাল। ইতালির সবচেয়ে সফল আলপাইন স্কিয়ার আলবের্তো তোমবা এবং দেবোরা কোম্পাগনোনি মিলানে মশাল জ্বালান। তারা উভয়েই তিনটি করে অলিম্পিক স্বর্ণপদক জিতেছেন। কোর্তিনায় মশাল জ্বালান সোফিয়া গোগিয়া, যিনি ২০১৮ সালে অলিম্পিক ডাউনহিল স্বর্ণ জেতা প্রথম ইতালীয় নারী এবং এবারের মিলানো কোর্তিনা অলিম্পিকে ইতালির শীর্ষ পদক প্রত্যাশীদের একজন।
মারিয়া ক্যারি থেকে আর্মানি শ্রদ্ধাঞ্জলি
মার্কিন পপ তারকা মারিয়া ক্যারি অনন্য এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রাণ সঞ্চার করেন। তিনি ১৯৫০-এর দশকের বিখ্যাত ইতালীয় গান “নেল ব্লু, দিপিন্তো দি ব্লু” (“নীলে আঁকা নীল”) এবং এর বিখ্যাত “ভোলারে” (“উড়ে যাওয়া”) পরিবেশন করেন। স্টেডিয়ামে করতালিতে মুখরিত হয় পরিবেশ। ৮৪ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট ম্যাতারেলাকে রেকর্ড করা ভিডিও ক্লিপে মিলানের ঐতিহাসিক ট্রামে শহর ভ্রমণ করতে দেখা যায়।
অনুষ্ঠানে গত সেপ্টেম্বরে প্রয়াত ইতালীয় ফ্যাশন ডিজাইনার জর্জিও আর্মানিকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়, যিনি মিলানকে তার কর্মক্ষেত্র বানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটি ফ্যাশনের শহর মিলান থেকে শুরু করে আলপসের ছোট পর্বত শহরগুলো পর্যন্ত ইতালীয় জীবনের বৈচিত্র্য উদযাপন করে। ক্রীড়াবিদরা লিভিগনো এবং প্রেদাজ্জোর পর্বত স্থানেও প্যারেডে অংশ নেন। এই গেমস ২২,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

কোর্তিনায় প্রাথমিকভাবে প্রবেশাধিকার নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি ছিল। পাদোভার লোরেদানা ভিদো, যিনি কোর্তিনায় দ্বিতীয় একটি বাড়ির মালিক, শহরের প্রধান রাস্তা কর্সো ইতালিয়ার শুরুতে আটকে যান। তিনি বলেন, “আমাদের বলা হয়নি যে সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমরা ভেবেছিলাম এটি বিনামূল্যে প্রবেশযোগ্য।”
তবে কোর্তিনায় কিছু প্রতিযোগী মিলান পর্যন্ত না গিয়েও অনুষ্ঠানের অংশ হতে পেরে খুশি। মার্কিন স্কেলেটন দলের অস্টিন ফ্লোরিয়ান বলেন, “আমি কি পুরো অনুষ্ঠানে থাকতে চাই? হয়তো। আমি কি খুশি যে সেদিন ১০ ঘণ্টা বাসে কাটাতে হচ্ছে না? হ্যাঁ।”
মিলানে শুক্রবার বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, সপ্তাহান্তে আরও পরিকল্পিত রয়েছে। ইতালীয় অর্থনৈতিক রাজধানীতে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) বিভাগের বিশ্লেষকদের উপস্থিতির বিরোধিতা করছেন অনেকে। ইতালি সরকার জানিয়েছে, এই বিতর্ক ভিত্তিহীন এবং অলিম্পিকের সময় আইসিই কর্মীরা রাস্তায় নেই। স্কুল ও রাস্তা বন্ধের মতো স্থানীয় সমস্যাও কিছু মিলানবাসীকে বিরক্ত করেছে।
মিলানো কোর্তিনা অলিম্পিক এভাবেই শুরু হলো – জাঁকজমক, উত্তেজনা এবং ঐক্যের আহ্বান নিয়ে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















