ডিসেম্বরে এক চীনা মুখপাত্র বলেছিলেন, অনিশ্চিত বিশ্বে সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা হলো চীন। ইউরোপে যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বিশ্বের কিছু মানুষের কাছে এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারসহ একাধিক পশ্চিমা নেতা সম্প্রতি বেইজিং সফর করেছেন, নির্ভরযোগ্যতা ও চুক্তির আশায়।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, চীনের রাজনীতি মোটেও স্থির নয়।
সামরিক শীর্ষ পর্যায়ে নজিরবিহীন তদন্ত
২৪ জানুয়ারি চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সর্বোচ্চ পর্যায়ের দুই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়া ও লিউ ঝেনলির বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তদন্ত চলছে। ১৯৭১ সালের পর এই প্রথম চীনা সামরিক বাহিনীর শীর্ষে এমন শুদ্ধি অভিযান দেখা গেল, যখন মাও সেতুংয়ের উত্তরসূরি লিন বিয়াও অভ্যুত্থানচেষ্টার অভিযোগে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন।

দুই মিলিয়ন সদস্যের পিপলস লিবারেশন আর্মির শীর্ষ পর্যায়ে এই অভিযান একই সঙ্গে দলীয় কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যাপক পদক্ষেপের অংশ। চীনের রাজনীতি অনেকটাই অস্বচ্ছ হলেও লক্ষণ বলছে, এটি কমিউনিস্ট পার্টির ওপর শি চিনপিংয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের প্রকাশ।
দুর্নীতি দমন না ক্ষমতা সংহতি?
২০২৫ সালে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক বিচ্যুতির অভিযোগে এক মিলিয়নের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে, যা দুই বছর আগের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি এবং ২০১২ সালে শি ক্ষমতায় আসার পর সর্বোচ্চ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়, বরং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার পদ্ধতি।
স্বাধীন গণমাধ্যম বা আইনি নজরদারি না থাকায় কমিউনিস্ট পার্টি নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করে। তবে এই প্রক্রিয়া নিম্নস্তর পর্যন্ত ভীতি ছড়ায়, পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ায় এবং সংস্কারপন্থীদের কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
সেনর দপ্তরে বৈঠকের সময় ২০৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে ৩৭ জন অনুপস্থিত ছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে ধারণা করা হয়।
সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব
সামরিক পত্রিকা ইঙ্গিত দিয়েছে, অভিযুক্ত দুই জেনারেলের পতন দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হলেও তাদের শি চিনপিংয়ের প্রতি অবাধ্যতার অভিযোগও রয়েছে। তাদের প্রভাবকে অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এতে বাহিনীর রাজনৈতিক পরিবেশ ও যুদ্ধ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চীনা সামরিক শক্তি দ্রুত বাড়ছে। নৌবাহিনীর আকার ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বড়। ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ছয়টি বিমানবাহী রণতরী যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার এক হাজারের বেশি ওয়ারহেডে পৌঁছাতে পারে।
তবু শুদ্ধি অভিযানের ফলাফল জটিল। স্বল্পমেয়াদে এটি বাহিনীর কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতা বাড়াতেও পারে। বড় ঝুঁকি হলো সংকট মুহূর্তে শিকে পরামর্শ দেওয়ার মতো অভিজ্ঞ নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হওয়া।
তাইওয়ান সংকটের আশঙ্কা
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান দখলে সক্ষম হতে বাহিনীকে প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন শি। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র সরবরাহ করলেও সরাসরি সামরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালি—সবই উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা। চীন নিয়মিত শক্তি প্রদর্শন করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা টহল দিচ্ছে। সামান্য দুর্ঘটনাও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যেখানে শান্ত মাথার সামরিক নেতৃত্ব অপরিহার্য।

অভিজ্ঞ নেতৃত্বের শূন্যতা
ঝাং ইউশিয়া ছিলেন বিরল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জেনারেল, যিনি ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং বিশ্লেষকদের মতে শির বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়ার সাহস রাখতেন। এখন তিনি ও লিউ অপসারিত হওয়ায় কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশন কার্যত শূন্য হয়ে পড়েছে।
২০২২ সালের পর থেকে ছয়জন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে পাঁচজনকেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট রয়েছেন কেবল শি নিজে এবং দুর্নীতিবিরোধী দায়িত্বে থাকা এক রাজনৈতিক কর্মকর্তা, যার সামরিক অভিজ্ঞতা সীমিত।
অতিরিক্ত আনুগত্যের ঝুঁকি
নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা যদি কেবল অনুগত হন, তবে তারা কি শিকে তাইওয়ান আক্রমণের প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করবেন? এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

মাওয়ের ছায়ায় দীর্ঘ শাসনের ইঙ্গিত
শি নিশ্চয়ই ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যর্থতা ও তাইওয়ান আক্রমণের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি সম্পর্কে অবগত। তবু বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী বছরের দলীয় সম্মেলনে তিনি ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করবেন এবং সর্বস্তরে আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেবেন।
অনিশ্চিত বিশ্বে এমন একমাত্র নিশ্চিততা বিশ্ববাসীর জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















