২ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। তিনি বলেছিলেন, সবকিছু প্রস্তুত আছে। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে হাজারো ইরানির মৃত্যুর পরও মধ্যপ্রাচ্য অনিশ্চয়তায় রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র কবে বা আদৌ সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালালে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে। শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শক্তিধর দেশ নতুন সংঘাত এড়াতে চেয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছিল। তবে এখন তাদের অবস্থান আগের তুলনায় ভিন্ন ও জটিল হয়ে উঠেছে।

ইসরায়েলের অবস্থানের পরিবর্তন
প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল ইরানে হামলার বিরোধিতা করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, প্রতীকী হামলা ইরানকে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সুযোগ দেবে, যখন ইসরায়েল আরেকটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়। সাধারণত ইরানবিরোধী কড়া অবস্থানের জন্য পরিচিত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও তখন সংযত ছিলেন এবং বলেছিলেন, বিপ্লব ভেতর থেকেই হওয়া ভালো।
কিন্তু এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যায়। এখন ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে হামলার জন্য উৎসাহিত করছে। তাদের জেনারেলরা ওয়াশিংটনে গিয়ে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ৩ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যেখানে নেতানিয়াহু তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা অর্থহীন।
সৌদি আরবের সতর্ক কিন্তু পরিবর্তিত অবস্থান
সৌদি আরব শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রকে হামলা না করার পরামর্শ দিয়েছিল এবং নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার কথা জানায়। তারা এখনও যুদ্ধ চায় না, তবে হামলা হলে পরিকল্পনায় অংশ নিতে আগ্রহী। জানুয়ারির শেষে প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, হামলা না হলে ইরানের শাসন আরও সাহসী হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি ও আঞ্চলিক উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক সমাবেশ ইসরায়েলকে আশ্বস্ত করেছে। আরব সাগরে শক্তিশালী যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের আগমন এবং অঞ্চলে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিমান হামলার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে, যা ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিরোধে সহায়ক।
তবে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার ফল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় ইরান দুর্বল মনে হলেও, যদি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে কোনো সমঝোতা হয়, তা তেহরানের শাসনের জন্য নতুন জীবনরেখা হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা ইসরায়েল ও সৌদি আরব উভয়েরই।
সমঝোতার সীমা ও আঞ্চলিক মতপার্থক্য
![]()
আগের আলোচনাগুলো মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে ছিল, যা গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ১২ দিনের যুদ্ধে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার নিয়ে কঠোর অবস্থানে থাকা ইরান এখন কিছুটা ছাড় দিতে পারে। কিন্তু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের অর্থায়ন সীমিত করার বিষয়ে তারা এখনও অনড়।
এতে আশঙ্কা রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো শুধু পারমাণবিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সমঝোতা সীমাবদ্ধ রাখবে এবং ইরানকে বড় চাপ থেকে মুক্তি দেবে। অন্যদিকে তুরস্ক সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করছে। ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং যুদ্ধ শুরু হলে শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে বলে তারা শঙ্কিত। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান যুক্তরাষ্ট্রকে ধাপে ধাপে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন, শুরুটা পারমাণবিক ইস্যু দিয়ে করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তুরস্কের বাড়তি প্রভাব ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইতিমধ্যে সৌদি আরব ও মিশর সফর করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক পথ বেছে নিলে তুরস্ক প্রধান অংশীদার হতে পারে, আর হামলা হলে ইসরায়েলের সম্পৃক্ততা প্রায় নিশ্চিত।

২০২৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ায় বিপ্লবের পর থেকে তুরস্কের প্রভাব বেড়েছে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ট্রাম্প মনে করেন, আসাদ শাসনের পতনে এরদোয়ানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে নেতানিয়াহুর বিশ্বাস, লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হামলাই আসাদের পতন ত্বরান্বিত করেছে। তুরস্ক ও কাতার গাজায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে, যদিও হামাসের নেতৃত্বের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক নিয়ে ইসরায়েল গভীরভাবে সন্দিহান।
অস্থির মধ্যপ্রাচ্য ও নতুন সম্ভাবনার দ্বন্দ্ব
গত দুই বছরের যুদ্ধের ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি অঞ্চলটি। ট্রাম্পের পদক্ষেপে জোটসমূহের ভারসাম্যও বদলে গেছে। সামরিক সাফল্যের পর একসময় ইসরায়েল নিজেকে আঞ্চলিক প্রধান শক্তি মনে করলেও এখন ইরান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল দেখাচ্ছে। প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ বিশৃঙ্খলা ডেকে আনবে, তবে একই সঙ্গে নতুন সুযোগের দরজাও খুলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















