ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় তিগ্রে অঞ্চলে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আবারও প্রমাণ করছে, সেখানে প্রতিষ্ঠিত শান্তি কতটা অনিশ্চিত ও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকের সামনে উদ্বিগ্ন মানুষের দীর্ঘ সারি, দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া নগদ অর্থ, খালি দোকানের তাক, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং খাদ্য মজুতের হিড়িক—গত এক বছরে অন্তত তিনবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে তিগ্রের বাসিন্দারা। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের যুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা আবারও তীব্র হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও যুদ্ধের শঙ্কা
জানুয়ারি ২৯ তারিখে ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী ও তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের অনুগত বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের পর সরকার তিগ্রেতে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করে। দুই দিন পর সরকারি ড্রোন তিগ্রের মধ্যাঞ্চলের গভীরে হামলা চালায়। তিগ্রের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট তাদেসে ওয়েরেদে এই পরিস্থিতিকে “প্রায় সর্বাত্মক যুদ্ধের মতো” বলে বর্ণনা করেন।

তবে আপাতত বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো গেছে বলে মনে হচ্ছে। তাদেসে জানান, তার বাহিনী সপ্তাহান্তে দখল করা কিছু এলাকা থেকে সরে এসেছে এবং মতবিরোধ সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ফেব্রুয়ারি ৩ তারিখে তিগ্রেতে পুনরায় ফ্লাইট চালু করার অনুমতি দেওয়া হয়।
তবুও সহিংসতার ঝুঁকি রয়ে গেছে
একই দিনে পার্লামেন্টে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আবিয় আহমেদ টিপিএলএফকে “বিশ্বাসঘাতক” আখ্যা দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ইথিওপিয়াকে ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন। টিপিএলএফের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী পূর্ণ শক্তিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সংকটের শিকড় পূর্ববর্তী যুদ্ধে
২০১৮ সালে ক্ষমতায় এসে আবিয় আহমেদ দ্রুত এমন এক জোট গঠন করেন, যারা টিপিএলএফের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল। তার মিত্রদের মধ্যে আমহারা অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী মিলিশিয়ারাও ছিল। ২০২০ সালের যুদ্ধে আমহারা মিলিশিয়া পশ্চিম তিগ্রে দখল করে এবং জাতিগত নিধনের অভিযোগ ওঠে। লক্ষাধিক তিগ্রেয়ান তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় এবং অনেকেই এখনও শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

২০২২ সালের শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের সংকট
২০২২ সালের শান্তিচুক্তি বাস্তুচ্যুতদের ঘরে ফেরানো এবং আঞ্চলিক বিরোধ সমাধানের পথ খুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে যারা ফিরেছিল, তাদের অনেকেই আমহারা মিলিশিয়ার ভয়ভীতি ও নির্যাতনের মুখে পড়ে। ফলে অধিকাংশ বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনও ফিরে যেতে সাহস পাচ্ছে না। টিপিএলএফের দাবি সত্ত্বেও দখলকৃত এলাকা আমহারার কাছ থেকে ফিরিয়ে দিতে আবিয় সরকার অনাগ্রহী।
সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতি ও আশঙ্কা
গত সপ্তাহে টিপিএলএফ বাহিনী হঠাৎ তেকেজে নদী পার হয়ে ত্সেলেমতি এলাকায় প্রবেশ করলে তারা জানায়, ফেরত আসা তিগ্রেয়ানদের প্রতি সেনাবাহিনীর আচরণের প্রতিবাদ জানাতেই এই পদক্ষেপ। তবে অনেকের ধারণা, কৌশলগত অবস্থান দখল বা সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা পরীক্ষা করাই ছিল প্রকৃত উদ্দেশ্য। আবিয় দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা করছেন, টিপিএলএফ পশ্চিম তিগ্রে পুনর্দখল করে সুদানে মিত্রদের সঙ্গে সরবরাহ পথ খুলতে চাইছে। ফলে সরকার এই অগ্রগতিকে বড় আক্রমণের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছে। সীমান্তে সেনা ও অস্ত্র সমাবেশ বাড়ছে, আর দক্ষিণ তিগ্রেতে টিপিএলএফ ও সরকারপন্থী মিলিশিয়াদের মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যস্থতার প্রস্তাব
জানুয়ারি ৩০ তারিখে আফ্রিকান ইউনিয়ন মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও ইথিওপিয়া ব্যক্তিগতভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানায়। আবিয়ের ঘনিষ্ঠ মহলের কেউ কেউ হয়তো মনে করছেন, টিপিএলএফের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসে গেছে।
আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি
তবে যুদ্ধ যে অবশ্যম্ভাবী, তা নয়। টিপিএলএফ দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দুর্বল হয়েছে। অন্যদিকে আবিয়েরও বহু শত্রু রয়েছে, যার মধ্যে প্রতিবেশী ইরিত্রিয়া টিপিএলএফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সুদানের গৃহযুদ্ধ ও বহিরাগত শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ইথিওপিয়ার সংকটকে জটিল করে তুলছে। তিগ্রেতে নতুন যুদ্ধ শুরু হলে তা পুরো অঞ্চলের জন্য বড় বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। তাই সময় থাকতে শান্তির পথ খুঁজে বের করা জরুরি।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















