হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো নির্দেশনা পেয়ে স্বয়ংক্রিয় ড্রোনের মাধ্যমে রক্ত, টিকা ও জরুরি ওষুধ পৌঁছে যাচ্ছে আফ্রিকার বিভিন্ন ক্লিনিকে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জিপলাইন ঘানা, আইভরি কোস্ট, কেনিয়া, নাইজেরিয়া ও রুয়ান্ডার প্রায় ১৫ হাজার ক্লিনিকে এ সেবা দিচ্ছে। তাদের সম্প্রসারণে সহায়তা করছে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের নতুন ধরনের মার্কিন সহায়তা চুক্তি, যেখানে স্থানীয় বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক এবং ফলাফলের ভিত্তিতে অর্থায়ন নির্ধারিত হয়। প্রচলিত সহায়তা পদ্ধতি থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন সহায়তার নতুন কৌশল
এক বছর আগে ইউএসএইড বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সহায়তা নতুন রূপ নিতে শুরু করে। গত সেপ্টেম্বর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক দ্বিপাক্ষিক স্বাস্থ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মোট মূল্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার এবং এতে ডজনখানেকের বেশি আফ্রিকান দেশ যুক্ত হয়েছে। লক্ষ্য আরও বেশি চুক্তি সম্পন্ন করা। “আমেরিকা ফার্স্ট” কৌশলের অধীনে প্রয়োজনভিত্তিক অনুদানের বদলে এমন লেনদেনভিত্তিক চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক, নিরাপত্তা ও আদর্শগত স্বার্থকে এগিয়ে নেয়।

চুক্তির শর্ত ও অগ্রাধিকার
পাঁচ বছর মেয়াদি এসব চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ওষুধ ও টিকা কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়, কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যয়ও বহন করে। এই সহায়তার মূল লক্ষ্য এইচআইভি, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও পোলিও প্রতিরোধ এবং রোগের প্রাদুর্ভাব পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন উন্নত করা। এর বিনিময়ে আফ্রিকান দেশগুলোকে মার্কিন পণ্য কেনা, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের প্রবেশাধিকার দেওয়া এবং নীতিমালা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে বলা হচ্ছে।
ব্যয়ের পতন ও বৈষম্যের আশঙ্কা
নতুন চুক্তিগুলোর মোট অর্থ আগের তুলনায় অনেক কম হতে পারে। একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আটটি দেশের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের তুলনায় প্রথম বছরেই মার্কিন স্বাস্থ্য ব্যয় গড়ে ৪৯ শতাংশ কমে যাবে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তা আরও দ্রুত হ্রাস পাবে। দ্রুত ও অগোছালো প্রক্রিয়ায় হওয়া এই পরিবর্তনে আফ্রিকার কিছু দেশ সুবিধা পেলেও অন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বড় অর্থনীতি, খনিজসম্পদসমৃদ্ধ বা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবে।

বিতর্কিত উদাহরণ
জাম্বিয়ার একটি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে খনিজসম্পদে প্রবেশাধিকার দেওয়ার শর্তের সঙ্গে যুক্ত। নাইজেরিয়ায় ২.১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাস্থ্যসেবা খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে। কেনিয়ার ১.৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সংসদীয় পরামর্শের অভাব এবং রোগীর তথ্য সুরক্ষা আইন ভঙ্গের আশঙ্কায় পুনর্বিবেচনার অপেক্ষায় আছে। সমালোচকদের মতে, এই লেনদেনভিত্তিক পদ্ধতি মানবিক সহানুভূতির দীর্ঘ ঐতিহ্য থেকে সরে যাচ্ছে।
স্থানীয় বিনিয়োগের চাপ
সহ-অর্থায়নের শর্ত আফ্রিকান দেশগুলোকে স্বাস্থ্যখাতে নিজস্ব ব্যয় বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে। যেমন কেনিয়াকে অতিরিক্ত ৮৫০ মিলিয়ন ডলার এবং নাইজেরিয়াকে পাঁচ বছরে আরও ৩ বিলিয়ন ডলার যোগ করতে হবে। নীতিগতভাবে এটি ইতিবাচক হলেও আশঙ্কা রয়েছে—অর্থসংকটে থাকা দেশগুলো বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল ঋণ নিতে পারে।

আদর্শগত শর্তের প্রভাব
নতুন নিয়ম অনুযায়ী গর্ভপাতসংক্রান্ত সেবা সীমিত করা এবং বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি প্রচারের ব্যয় কমানোর শর্ত যুক্ত হয়েছে। এটি আগের “গ্লোবাল গ্যাগ রুল”-এর বিস্তৃত সংস্করণ, যা অতীতে পরিবার পরিকল্পনা ও গর্ভনিরোধক সেবায় প্রভাব ফেলেছিল। নতুন বিধান সামরিক সহায়তা ছাড়া প্রায় সব ধরনের মার্কিন সহায়তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে।
মানবিক সহায়তা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি
আদর্শগত শর্ত আরোপের ফলে জরুরি সহায়তা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বন্যায় বাস্তুচ্যুত প্রায় তিন লাখ মানুষ কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছে—এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। সমালোচকদের মতে, “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির অতিরিক্ত জোর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিতে পারে, যা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















