সাংবাদিকরা অনেক সময় বিরক্তিকর মনে হতে পারেন। তারা বিষয়কে সরল করে দেখান, কখনও বাড়িয়ে বলেন, আবার কখনও ভুলও করেন। বেশিরভাগই উচ্চশিক্ষিত, মধ্যবিত্ত এবং কিছুটা বামঘেঁষা হওয়ায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের সবার সঙ্গে মেলে না। যখন তারা অনৈতিক আচরণ করেন—যেমন একটি টেলিভিশন প্রতিবেদনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য বিভ্রান্তিকরভাবে সম্পাদনা করে দেখানো হয়েছিল—তখন জনমনে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের পর ধনী দেশগুলোতে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমেছে। তাই সাংবাদিকতার সংকটের খবর অনেকের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি সবার জন্যই উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অবনতি
বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পিছিয়ে যাচ্ছে। ২০১৪ সালের পর থেকে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের সূচকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা আজকের আমেরিকার অবস্থার চেয়েও খারাপ এবং সার্বিয়ার মতো দেশের সমতুল্য—যেখানে দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ কাভার করা সাংবাদিকদের পুলিশ প্রায়ই মারধর করে।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু একটি মৌলিক অধিকার নয়; এটি অন্যান্য অধিকারের ভিত্তি। একই সঙ্গে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতাবানরা যদি জানেন যে তাদের অপব্যবহার প্রকাশ পাবে না, তাহলে তারা আরও বেশি অনিয়ম করতে উৎসাহিত হন।
সংবাদমাধ্যম দমন ও দুর্নীতির পারস্পরিক সম্পর্ক
প্রায় ১৮০টি দেশের ৮০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমকে দমন করা এবং দুর্নীতি বৃদ্ধির মধ্যে একটি চক্রাকার সম্পর্ক রয়েছে। যারা জনগণের সম্পদ লুট করতে চান, তারা প্রথমে সংবাদমাধ্যমকে চুপ করাতে চান। সংবাদমাধ্যম যত দুর্বল হয়, দুর্নীতি তত সহজ হয়। আবার দুর্নীতি বাড়লে ভবিষ্যতের সমালোচনামূলক প্রতিবেদন ঠেকানোর আগ্রহও বাড়ে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যদি কানাডার মতো মান থেকে ইন্দোনেশিয়ার মতো অবস্থায় নেমে যায়, তবে দুর্নীতি আয়ারল্যান্ডের স্বচ্ছতা থেকে লাটভিয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটে, ফলে ভোটাররা অনেক সময় পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত তা টের পান না। জনতাবাদী সরকারগুলোর অধীনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, কারণ তারা সমালোচকদের শত্রু হিসেবে দেখায় এবং ক্ষমতা সীমিত করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করে।
গণতান্ত্রিক দাবিদার সরকারের কৌশল
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলোর একটি হলো—নিজেদের গণতান্ত্রিক দাবি করা সরকারগুলো ক্রমেই স্বৈরাচারী কৌশল ব্যবহার করছে। তারা সরাসরি সত্যকে নিষিদ্ধ না করে এমন এক গণমাধ্যম পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে শাসকদলের প্রশংসা জোরালোভাবে প্রচারিত হয় এবং ভিন্নমত ক্ষীণ হয়ে যায়। সরকারি অর্থ দিয়ে অনুগত প্রচার বাড়ানো, রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যমে অনুগত ব্যক্তিদের বসানো, সরকারি বিজ্ঞাপন সুবিধাভোগী সংবাদপত্রে দেওয়া এবং ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে স্বাধীন গণমাধ্যম অধিগ্রহণ—এসবই এই কৌশলের অংশ।

সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার ওপর চাপ
যে সংবাদমাধ্যম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চালিয়ে যায়, তারা প্রায়ই সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে বঞ্চিত হয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের এড়িয়ে চলতে চাপ দেওয়া হয়। নিয়মিত কর তদন্ত ও হয়রানিমূলক মামলার মুখে পড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে না। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের জরিপ অনুযায়ী, ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬০ দেশেই সংবাদমাধ্যম আর্থিকভাবে অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ঝুঁকি
অনেক সরকার সরাসরি সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ক্ষমতাবানদের বিরক্ত করলে বিশেষ করে নারী সাংবাদিকরা অনলাইনে হুমকি ও হয়রানির শিকার হন। জাতিসংঘের এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক অনলাইন নির্যাতনের মুখে পড়েছেন এবং ৪২ শতাংশ সরাসরি হুমকি বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা আইন বা ভুয়া তথ্যবিরোধী আইনের অপব্যবহার করে সমালোচনামূলক কণ্ঠ দমন করা হচ্ছে। কখনও সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্কহীন অভিযোগেও মামলা দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ফিলিপাইনে এক সাংবাদিককে সন্ত্রাসে অর্থায়নের অভিযোগে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রমাণ জাল করার অভিযোগ তুলেছেন।

ডিজিটাল যুগের দ্বিমুখী বাস্তবতা
প্রযুক্তি সাংবাদিকতার ধারণা বদলে দিয়েছে এবং মতপ্রকাশের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। যে কেউ মোবাইল ফোনে অন্যায়ের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারে, যা পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ডিজিটাল বিপ্লব প্রত্যাশিত মুক্তি আনেনি। স্বৈরাচারী সরকার প্রয়োজনে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়, আর দুর্বল গণতন্ত্রগুলো গোপনীয়তা আইন বা নজরদারির মাধ্যমে সাংবাদিকদের উৎস শনাক্ত করে ভয় দেখায়। কখনও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করেও চাপ সৃষ্টি করা হয়।
আন্তর্জাতিক সমর্থনের দুর্বলতা
একসময় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াত। কিন্তু সাম্প্রতিক নীতিতে বিদেশি স্বাধীন গণমাধ্যমে সহায়তা কমানো হয়েছে এবং কিছু আন্তর্জাতিক সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশের কর্তৃত্ববাদী নেতারা সাংবাদিকদের দমন করতে আরও উৎসাহ পাচ্ছেন, কারণ কূটনৈতিক চাপের আশঙ্কা কমে গেছে।
উপসংহার
সংবাদমাধ্যমের সমালোচকরা প্রায়ই বলেন, গণমাধ্যমকেও জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে। বাস্তবে পাঠক সাবস্ক্রিপশন বন্ধ করতে পারেন, মানহানির মামলা করা যায়, এমনকি বড় কেলেঙ্কারিতে নেতৃত্ব বদলও ঘটে। ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের কাজ বন্ধ করে দিলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। শক্তিশালী সংবাদ সংগ্রহব্যবস্থা একবার ধ্বংস হলে তা পুনর্গঠন করা কঠিন। আর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে গেলে বিশ্ব আরও দুর্নীতিগ্রস্ত ও খারাপভাবে শাসিত হয়ে পড়বে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















