ফেরার পথ, কিন্তু কোথায় স্বস্তি
তাত্ত্বিকভাবে গাজা পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি কাঠামোর অধীনে হামাসের পরিবর্তে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত গাজা প্রশাসনের জাতীয় কমিটি অঞ্চলটির শাসনভার নেওয়ার কথা। দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে জ্যারেড কুশনার গাজার পুনর্গঠনের একটি আকর্ষণীয় মানচিত্রও উপস্থাপন করেন, যেখানে সমুদ্রতীরবর্তী ঝকঝকে কর্নিশের পরিকল্পনা ছিল। ইসরায়েল তাদের সব জিম্মিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেছে, ফলে শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ—পুনর্গঠন—শুরু হওয়ার কথা। ২ ফেব্রুয়ারি মিসরের সঙ্গে রাফাহ সীমান্তও পুনরায় খুলে দেওয়া হয়, যা ২০২৪ সালের মে মাস থেকে প্রায় পুরো সময় বন্ধ ছিল।

কিন্তু বাস্তবতা আরও কঠিন
যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি বিমান হামলায় গাজায় প্রায় ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। খাদ্য সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও টমেটোর মতো সাধারণ পণ্য এখনো বিলাসদ্রব্যের মতো। এক মিলিয়নের বেশি মানুষ ধ্বংসস্তূপ বা তাবুতে আশ্রয় নিয়ে আছে, বিদ্যুৎ সুবিধা প্রায় নেই বললেই চলে। তীব্র শ্বাসযন্ত্রজনিত সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। কর্মীদের তালিকা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় মেডিসিনস সঁ ফ্রঁতিয়েরসহ কয়েকটি ত্রাণ সংস্থাকে ইসরায়েল চলে যেতে বলেছে। এর আগে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার কিছু কর্মী ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ তুলেছিল ইসরায়েল।
রাফাহ সীমান্ত খোলা, কিন্তু সীমিত
অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরই রাফাহ সীমান্ত খোলার কথা ছিল। বাস্তবে খোলার দিন মাত্র পাঁচজন রোগী ও সাতজন স্বজনকে বের হতে দেওয়া হয়, যদিও প্রায় ২০ হাজার গাজাবাসীর জরুরি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া প্রয়োজন। সেদিন গাজায় ফেরার জন্য নিবন্ধিত ৫০ জনের মধ্যে কেবল তিন নারী ও নয় শিশুকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তাদের দাবি, সীমান্ত পার হতে ১৫ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে এবং পথে ইউরোপীয় পর্যবেক্ষক, ইসরায়েলঘনিষ্ঠ ফিলিস্তিনি মিলিশিয়া ও ইসরায়েলি নিরাপত্তাকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে।
প্রশাসনিক অচলাবস্থা
যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে হামাস গাজার ক্ষমতা প্রশাসনিক কমিটির হাতে তুলে দিতে সম্মত হলেও ইসরায়েল এখনো ওই কমিটিকে গাজায় ঢুকতে দেয়নি। কমিটির কোনো তহবিল বা ব্যাংক হিসাব নেই; সদস্যরা কায়রোর একটি হোটেলে অপেক্ষা করছেন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতীকের আদলে একটি লোগো উন্মোচনের চেষ্টা করা হলেও ইসরায়েলের আপত্তিতে তা দ্রুত প্রত্যাহার করা হয়। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস জোর দিয়ে বলছেন, এই কমিটির সব অর্থ তার মাধ্যমেই যেতে হবে।
পুনর্গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা
লাভজনক পুনর্গঠন প্রকল্পের আশায় মার্কিন ও ইসরায়েলি কিছু প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থায়নের দিকে তাকিয়ে আছে। তবে ২ ফেব্রুয়ারি আমিরাত এমন কোনো পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে। ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ জেরুজালেমে বারবার সফর করে ইসরায়েলকে গাজার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভেস্তে না দিতে রাজি করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সহিংসতার চক্র থামছে না
ইসরায়েলের মতে, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজায় অর্থবহ কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠন করে অঞ্চলটিকে সামরিকমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা গাজা ছাড়বে না। কিন্তু এমন কোনো বাহিনী এখনো গঠিত হয়নি। অন্যদিকে হামাসও নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনা করছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে। তারা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করছে, যেখানে নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল শুল্ক রাজস্ব আটকে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
৩ ফেব্রুয়ারি গাজায় এক বন্দুকধারী ইসরায়েলি টহলদলে গুলি চালিয়ে এক কর্মকর্তাকে আহত করলে ইসরায়েল পাল্টা বিমান হামলা চালায়। এতে ২০ জন নিহত হয় এবং অল্প সময়ের জন্য রাফাহ সীমান্ত আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। সহিংসতার এই চক্রই গাজার স্থবির বাস্তবতাকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















