প্রায় চার দশক আগে, ১৯৮৮ সালে, নিউইয়র্কের এক ব্যবসায়ী ও ইরানের মাশহাদের এক ধর্মীয় নেতা তীব্র বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। একজন মার্কিন সেনার ওপর গুলি চললে তিনি ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ ধ্বংস করে দেবেন বলেও হুমকি দেন। অন্যদিকে তৎকালীন ইরানি প্রেসিডেন্ট আলি খামেনি ঘোষণা করেছিলেন, ওই জলপথকে তিনি আমেরিকানদের কবরস্থানে পরিণত করবেন।
চার দশক পরেও দুই নেতার ভাষা খুব একটা বদলায়নি। সম্প্রতি ইরানে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার অভিযোগ উপেক্ষা করায় ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে বড় সামরিক বহর পাঠিয়েছেন, যাকে তিনি “সুন্দর নৌবহর” বলে উল্লেখ করেন। জবাবে খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে। ট্রাম্প এই দীর্ঘ সংঘাতের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি চান—কথার মাধ্যমে হোক বা শক্তি প্রয়োগে। অন্যদিকে খামেনিকে অনেকেই সময়ের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ও অচল দৃষ্টিভঙ্গিতে আবদ্ধ নেতা হিসেবে দেখছেন। এই দুই প্রবীণ নেতার দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। জানুয়ারির শেষ দিকে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সেখানে পৌঁছেছে। অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, যুদ্ধবিমান, ডেস্ট্রয়ার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলা মোকাবিলায়। তবে শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ নিতে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত বলেও মনে হচ্ছে। তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ৬ ফেব্রুয়ারি ওমানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। মিশর, তুরস্ক ও উপসাগরীয় দেশগুলোর তৎপর কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলেই এই বৈঠকের আয়োজন, কারণ তারা কেউই আঞ্চলিক যুদ্ধ চায় না।
কূটনীতি সফল হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে দুই নেতার ওপর। ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে খামেনির মূল লক্ষ্য একই—ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা। তাঁর বিশ্বাস, রাজনৈতিক সংস্কার বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক অস্থিরতা, মিত্রদের দুর্বলতা, স্থবির পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকট এবং বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার কারণে তাঁর অবস্থান আরও নাজুক হয়েছে। যেসব ছাড় তিনি এতদিন দিতে চাননি, সেগুলো না দেওয়াই শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে।

ট্রাম্প অনেক দিক থেকে ভিন্ন চরিত্রের—স্থির মতাদর্শ নেই, তবে কিছু দীর্ঘদিনের বিশ্বাস রয়েছে। তাঁর ধারণা, ইরানের নেতারা বারবার দুর্বল মার্কিন প্রশাসনকে বোকা বানিয়েছে। জিমি কার্টারের সময় থেকে প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইরান প্রশ্নে চাপে পড়েছেন, আর ট্রাম্প নিজেকে সেই অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে সক্ষম নেতা হিসেবে দেখতে চান। সমাধানের পথ নিয়ে তিনি নমনীয় হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, সম্ভাব্য কোনো চুক্তি ২০১৫ সালের পারমাণবিক সমঝোতার চেয়েও কঠোর হতে হবে। ইরানকে শুধু পারমাণবিক কর্মসূচিই নয়, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন ও আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের সমর্থনও সীমিত করতে হবে।
ইরান অবশ্য ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে আলোচনায় রাজি নয়। তাদের মতে, অযৌক্তিক শর্ত না দিলে তবেই চুক্তি সম্ভব। কিছু কূটনীতিক বিকল্প পথ খুঁজছেন—পারমাণবিক ইস্যুতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে আলাপ। কিন্তু খামেনির অনড় অবস্থানের কারণে সেই পথও অনিশ্চিত। তাছাড়া সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনেও সম্ভাব্য সমঝোতা জনপ্রিয় হবে না।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রস্তুতি নিলেও ওয়াশিংটনের প্রচলিত ধারণা হলো, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। প্রশ্ন এখন আর হামলা হবে কি না—বরং কখন এবং কোথায় হবে। শুরুতে ধারণা ছিল প্রতীকী হামলায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারেন ট্রাম্প, যাতে অতীতের দুর্বলতার অভিযোগ এড়ানো যায়। কিন্তু অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বড় ধরনের আঘাতের সম্ভাবনাও বাড়ছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, যা রাজনৈতিক পরিবর্তন ডেকে আনতে পারে—যদিও সেই পরিবর্তনের ধরন এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
![]()
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















