দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সর্বশেষ কার্যকর চুক্তি নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই যুগ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হলো। এর ফলে বিশ্ব এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো বাধ্যবাধকতা আর অবশিষ্ট নেই।
চুক্তির অবসান ও নতুন বাস্তবতা
নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া নির্ধারিত সীমার বেশি কৌশলগত ওয়ারহেড মোতায়েন করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবু এই মুহূর্তটি ঐতিহাসিক, কারণ শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ সময়ের পর এবার প্রথমবারের মতো দুই পরাশক্তির ওপর কোনো আনুষ্ঠানিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামো রইল না।
কাগজে-কলমে কিছু বহুপাক্ষিক চুক্তি এখনো টিকে আছে। বহু দেশ এখনো বিস্ফোরণভিত্তিক পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ করার চুক্তি মানে এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিও কার্যকর রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

আধুনিকীকরণ ও অস্ত্র প্রতিযোগিতা
নিরস্ত্রীকরণের আলোচনা এগোনোর বদলে পারমাণবিক শক্তিধর সব রাষ্ট্রই নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়নে ব্যস্ত। যুক্তরাষ্ট্র আগামী তিন দশকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন, বোমারু বিমান ও ওয়ারহেড উন্নত করার পরিকল্পনা করছে। চীন দ্রুতগতিতে তার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, আর উত্তর কোরিয়াও নিজস্ব মজুত বৃদ্ধি করছে।
এছাড়া মহাকাশভিত্তিক অস্ত্র, প্রতারণামূলক টর্পেডো বা গ্লাইড যানসহ নতুন ধরনের পারমাণবিক প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগ বাড়ছে। একই সঙ্গে কৌশলগত নয়, অপেক্ষাকৃত স্বল্প ক্ষমতার ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র আবার সামরিক পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
ট্যাকটিক্যাল অস্ত্রের ঝুঁকি
ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্রের শক্তি তুলনামূলক কম এবং স্বল্প দূরত্বে ব্যবহারের উপযোগী। সমর্থকদের দাবি—এগুলো সীমিত ক্ষয়ক্ষতির কারণে ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ। একবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা ভাঙলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আরও বড় সমস্যা হলো, আক্রমণটি কৌশলগত না ট্যাকটিক্যাল—তা দ্রুত বোঝা যায় না। ফলে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলো ‘ব্যবহার না করলে হারাতে হবে’ যুক্তিতে পাল্টা হামলায় যেতে বাধ্য হতে পারে। এই অনিশ্চয়তাই বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিপর্যয়ের ঘড়ি ও বাড়তে থাকা আশঙ্কা
বিশ্ব পরিস্থিতির জটিলতা এতটাই বেড়েছে যে বিজ্ঞানীদের প্রতীকী ‘ডুমসডে ক্লক’ এখন মধ্যরাতের মাত্র ৮৫ সেকেন্ড আগে অবস্থান করছে—যা ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়গুলোর একটি। এমনকি কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময়ের চেয়েও এই অবস্থান কাছাকাছি বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।
অস্ত্র বাড়ানো নাকি প্রতিরোধনীতি
কিছু মহলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার আরও বাড়ানোর দাবি উঠেছে, যেন রাশিয়া ও চীনের যৌথ হুমকির মোকাবিলা করা যায়। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক কৌশলে নিরাপত্তা শুধু অস্ত্রসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রথম আঘাতের পরও পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা বজায় রাখা। এই প্রতিরোধনীতিই এখনো বড় যুদ্ধ ঠেকিয়ে রেখেছে।
আসল ঝুঁকি আকস্মিক প্রথম হামলার চেয়ে ভুল হিসাব-নিকাশ ও অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা বৃদ্ধি থেকে আসে। এমনকি প্রতিরক্ষামূলক নীতিও কখনো পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।

মিসাইল প্রতিরক্ষা ও নতুন উত্তেজনা
মহাদেশব্যাপী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ার ধারণা বাস্তবায়নযোগ্য না হলেও, তা প্রতিপক্ষকে ভীত করে তুলতে পারে। তারা আশঙ্কা করতে পারে—প্রতিরোধ ক্ষমতা হারালে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসী হয়ে উঠবে। ফলে মহাকাশে পারমাণবিক বিস্ফোরণ বা বিকল্প আক্রমণপথের পরিকল্পনা শুরু হতে পারে। এতে বৈশ্বিক নিরাপত্তা আরও দুর্বল হবে।
মিত্রদের আস্থা ও বিস্তার ঝুঁকি
মিত্র দেশগুলোর প্রতি অবমাননাকর আচরণ পারমাণবিক সুরক্ষা ছাতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। এতে ইউরোপ বা এশিয়ার দেশগুলো নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কথা ভাবতে পারে, যা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করবে। ইতিহাস দেখায়—পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র বাড়লে ঝুঁকিও বাড়ে।

সমাধানের পথ
বিশ্বের অস্তিত্বগত এই হুমকি কমানোর একমাত্র উপায় হলো নতুন করে আলোচনা শুরু করা। আদর্শভাবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে ধীরে ধীরে অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিকেও যুক্ত করতে হবে।
পারমাণবিক যুদ্ধ জয় করা যায় না এবং তা কখনোই লড়া উচিত নয়—এই মৌলিক নীতিতে সবাইকে একমত হতে হবে। এরপর ধাপে ধাপে ঝুঁকি কমানো, অস্ত্রব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। এই প্রক্রিয়া সফল হলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পুনর্গঠনের পথও খুলে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















