হাইতি যেন এক অস্থির সময় গণনার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যর্থ রাজনৈতিক রূপান্তরের শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশটি আরও গভীর বিশৃঙ্খলায় ডুবে গেছে। ২০২৪ সালে রাজধানী দখল নেওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় ফেরার যে আশা ছিল, তা ভেঙে পড়েছে। রূপান্তর কাল শেষ হওয়ার পর কে দেশ চালাবে, তা নিয়ে ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নয় সদস্যের অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি পরিষদ নতুন নির্বাচন আয়োজনের কথা থাকলেও নিজেদের ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্বেই ব্যস্ত থেকেছে। ঘুষ আদায়ের অভিযোগ ও উঠেছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এ সময়ে অপহরণ, ধর্ষণ ও লুটপাটে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে, বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখো মানুষ, আর ক্ষুধার মাত্রা পৌঁছেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের সমান পর্যায়ে।
নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার লড়াই
বিশ্ব রাজনীতির অন্য প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সমালোচক হলেও হাইতির প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। লক্ষ্য একটাই—নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা এবং বিভক্ত রাজনৈতিক সমঝোতায় আনা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তাকে সরানোর চেষ্টার অভিযোগে পরিষদের কয়েক সদস্যের ওপর নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানীর উপসাগরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি জোরালো করা হয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন থামেনি; কিছু সদস্য যৌথ রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মানবিক বিপর্যয়ের গভীরতা
রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলতেই সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ, প্রধান সরকারি হাসপাতাল অচল, সহিংসতায় বন্ধ হয়েছে শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। লক্ষাধিক শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে, আর খাদ্য সহায়তা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে প্রায় অর্ধেক জনগণের জন্য। যৌন সহিংসতার ঘটনা ও উদ্বেগজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মানবিক সংকটকে আরও প্রকট করেছে।

নতুন সামরিক ও নিরাপত্তা উদ্যোগ
এই অন্ধকার পরিস্থিতির মাঝেও কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। দুর্বল আন্তর্জাতিক পুলিশ মিশনের পরিবর্তে নতুন শক্তিশালী দমন বাহিনী গঠনের অনুমোদন দিয়েছে জাতিসংঘ। উন্নত সরঞ্জাম, ড্রোন ও আকাশ সহায়তাসহ আক্রমণাত্মক কৌশলে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে এই বাহিনীর। একই সঙ্গে হাইতির পুলিশ, আন্তর্জাতিক সহায়তা দল ও বিদেশি নিরাপত্তা ঠিকাদারদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স রাতের আকস্মিক অভিযানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে চাপে ফেলেছে।
পুলিশ শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা
সংকট থেকে বেরিয়ে আসার বড় অংশ নির্ভর করছে জাতীয় পুলিশের সক্ষমতার ওপর। নতুন নিয়োগের মাধ্যমে সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানে কিছু এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী পিছু হটেছে, খুলেছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফিরতে শুরু করেছে বাস্তুচ্যুত মানুষ। ড্রোন হামলায় বহু সশস্ত্র সদস্য নিহত হলেও নিরীহ মানুষের মৃত্যু ও ঘটেছে, যা পরিস্থিতির জটিলতাই তুলে ধরে। তবু এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ধারাবাহিক নিরাপত্তা প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনীতির সমাধানই চূড়ান্ত পরীক্ষা
নিরাপত্তা অগ্রগতির যে ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছে, তা টেকসই হবে কি না—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ পরিবর্তন চায়, কিন্তু সেই পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য জরুরি। সহিংসতা থামানো ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এই লড়াইয়ে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















