জাপানের কিছু মদ প্রস্তুতকারক বিদেশি ওক ব্যারেলের পরিবর্তে দেশীয় গাছের কাঠ ব্যবহার করে মদ পরিপক্ব করার পথে হাঁটছেন। এই উদ্যোগ একদিকে যেমন স্থানীয় স্বাদ ও ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরছে, অন্যদিকে তেমনি দেশীয় বনশিল্পকেও নতুন সম্ভাবনা দিচ্ছে।
স্থানীয় প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা
সাইতামা প্রিফেকচারের ওগাওয়া শহর সাধারণত মদের অঞ্চল হিসেবে পরিচিত নয়। চারদিকে পাহাড় ও ধানক্ষেতে ঘেরা এই শান্ত এলাকায় নির্মল পানি ও দীর্ঘদিনের জৈব কৃষি ঐতিহ্য মুগ্ধ করে মদ প্রস্তুতকারক ইউজো ফুকুশিমাকে।
মুসাশি ওয়াইনারিতে তিনি এমন নীতি অনুসরণ করেন যেখানে সার, কীটনাশক, রাসায়নিক বা কোনো সংযোজন ছাড়াই পুরো মদ তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। জাপানের কঠিন আবহাওয়ায় এটি একটি চ্যালেঞ্জিং কিন্তু ব্যতিক্রমী পদ্ধতি।

দেশীয় কাঠের ব্যারেলের ব্যবহার
ফরাসি বা আমেরিকান ওকের পরিবর্তে মুসাশি ওয়াইনারি সুগি, হিনোকি ও মিজুনারা—এই তিনটি জাপানি গাছের কাঠের ব্যারেলে মদ পরিপক্ব করে। সাধারণত এসব ব্যারেল হুইস্কি তৈরিতে ব্যবহৃত হলেও এখানে তা মদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
ফুকুশিমার প্রশ্ন ছিল—জাপানের প্রায় ৭০ শতাংশ ভূমি বনভূমি হওয়া সত্ত্বেও কেন বিদেশি ব্যারেলের ওপর নির্ভর করতে হবে? সরকারি সহায়তা ও গণঅর্থায়নের মাধ্যমে তিনি দেশীয় ব্যারেল সংগ্রহ করেন এবং একেবারে জাপানি বৈশিষ্ট্যের মদ তৈরির উদ্যোগ নেন।
এই প্রচেষ্টা সফলও হয়েছে। ২০২০ ও ২০২১ সালের ভিনটেজ মদ আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে।
স্বাদ ও বৈচিত্র্যের অনুসন্ধান
শোকোশি নামের স্থানীয় আঙুর থেকে তৈরি লাল মদ গভীর রঙ ও শক্ত স্বাদের। মৃত ইস্টের সঙ্গে দীর্ঘ সময় রেখে পরিপক্ব করার ফলে স্বাদ আরও সমৃদ্ধ হয়।

সুগি ব্যারেলে তৈরি মদে কাঠের ঘ্রাণের সঙ্গে মিষ্টি ও মসলাদার আভাস পাওয়া যায়। হিনোকি ব্যারেলের স্বাদ কারও কাছে তীব্র মনে হলেও অন্যদের কাছে তা অনন্য অভিজ্ঞতা। মিজুনারা ব্যারেলে পরিপক্ব মদে বনাঞ্চলের ঘ্রাণ ধীরে ধীরে চন্দন ও এলাচের মতো নরম সুবাসে রূপ নেয়।
ভবিষ্যতে চেস্টনাট ও চেরি কাঠের ব্যারেল ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নতুন অঞ্চলে ওয়াইনারির বিস্তার
গিফু প্রিফেকচারের তাকায়ামায় ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হিদা তাকায়ামা ওয়াইন অ্যাপোথেকারি এলাকাটির প্রথম ওয়াইনারি। এখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আঙুরের জাত চাষ করা হয়।
ওয়াইনারির লক্ষ্য মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি দেওয়ার মতো কোমল স্বাদের মদ তৈরি। স্থানীয় ব্যারেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতায় তারা মিজুনারা ব্যারেলে সাইডার ও শারডনে পরিপক্ব করার চেষ্টা করছে, যদিও বন্যার কারণে কিছু পরিকল্পনা বিলম্বিত হয়েছে।

কারুশিল্প ও বনশিল্পের সংযোগ
হিদা অঞ্চলের ৯২ শতাংশ বনভূমি। বহু শতাব্দীর কাঠশিল্প ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ব্যারেল তৈরিতেও যুক্ত হয়েছে।
মিজুনারা কাঠের জটিল গঠন ও লিকেজের ঝুঁকি সামলে ব্যারেল তৈরি করা কঠিন হলেও অভিজ্ঞ কারিগরদের দক্ষতা এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশীয় কাঠের ব্যবহার বনশিল্পকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
সিডার কাঠের পাত্রে ভিন্নধর্মী মদ
ইবারাকি প্রিফেকচারের বুরিউ ওয়াইনারিতে সিডার কাঠের বড় পাত্রে গাঁজন করে বিশেষ ধরনের লাল মদ তৈরি হয়েছে। এই পদ্ধতির পেছনে ঐতিহ্যবাহী কাঠের পাত্র সংরক্ষণ প্রকল্পের সহযোগিতা রয়েছে।
২৮০ বছর পুরোনো একটি সিডার গাছ থেকে তৈরি পাত্র ব্যবহার করে এই মদ প্রস্তুত করা হয়, যা নির্মাতাদের কাছে এক ধরনের সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে হয়েছে।

দেশীয় কাঠে ভবিষ্যতের স্বপ্ন
জাপানের ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান একটি মদ প্রস্তুতকারী গোষ্ঠী এখন দেশীয় কাঠ, স্থানীয় কারিগরি ও আঞ্চলিক স্বাদকে একত্র করে নতুন ধারা গড়ে তুলছে।
তাদের বিশ্বাস, এই উদ্যোগ শুধু মদের স্বাদেই বৈচিত্র্য আনবে না, বরং বন সংরক্ষণ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















