মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাম্প্রতিক আলোচনা সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত সাময়িকভাবে ঠেকিয়েছে এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার নতুন পথ খুলে দিয়েছে। জুন মাসে ইসরায়েলের বারো দিনের হামলার পর এই প্রথম দুই পক্ষ আলোচনায় বসে, যার উদ্দেশ্য ছিল আলোচনা প্রক্রিয়া ভেঙে দেওয়া এবং ইরানকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বৈঠককে নিবিড় ও ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত বলে উল্লেখ করে একে ভালো সূচনা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে এই আলোচনার সময় আরব সাগর ও উপসাগর এলাকায় মার্কিন নৌ শক্তির উপস্থিতি বৃদ্ধি, নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে জটিল রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, সমঝোতা না হলে পরিণতি অত্যন্ত কঠোর হবে।

পারমাণবিক চুক্তি ভাঙার পরিণতি
২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৫ সালের কার্যকর পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায় এবং দেড় হাজারের বেশি শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। ওই চুক্তির অধীনে ইরানকে সীমিত মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুতের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে। যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পরও ইরান এক বছর চুক্তি মেনে চলে, কিন্তু ইউরোপীয় ও অন্যান্য অংশীদার দেশ নিষেধাজ্ঞা লাঘবে ব্যর্থ হওয়ায় তেহরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধকরণ, মজুত বৃদ্ধি এবং উন্নত প্রযুক্তি উন্নয়নের পথে এগোয়। ফলে গত সাত বছরে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন আলোচনার সীমা ও মতপার্থক্য
ওমানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া পরোক্ষ আলোচনায় ইরান শুধু পারমাণবিক ইস্যু নিয়েই কথা বলতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী। তবে কূটনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে বর্তমান দফায় শুধু পারমাণবিক ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পূর্ববর্তী আলোচনায় শূন্য পারমাণবিক সক্ষমতার দাবি তেহরান প্রত্যাখ্যান করেছিল। সম্ভাব্য সমঝোতায় কয়েক বছর সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রেখে অধিকার বজায় রাখার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে, যদিও তা গ্রহণযোগ্য হবে কি না স্পষ্ট নয়।

চাপের মুখে ইরান
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সামরিক হামলা, পারমাণবিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিক্ষোভ ইরানকে দুর্বল করেছে। সম্ভাব্য নতুন সমঝোতায় কয়েক বছরের জন্য সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, পরে নিম্নমাত্রায় সীমিত রাখা এবং উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম তৃতীয় দেশে পাঠানোর মতো শর্ত থাকতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সহায়তা না দেওয়া এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে সংযম দেখানোর বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে, যদিও প্রতিরক্ষার স্বার্থে ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বজায় রাখতে ইরান অনড়।
নীতিগত ভুলের বিতর্ক
মার্কিন বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে তেহরানের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতা ও কঠোর নিষেধাজ্ঞাভিত্তিক নীতি উল্টো ইরানি শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্ত করেছে এবং জনসাধারণকে দুর্ভোগে ফেলেছে। তাদের মতে, আংশিক স্বাভাবিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা গড়ে উঠলে মধ্যপন্থী সমাজশক্তি শক্তিশালী হতো এবং ভেতর থেকেই গ্রহণযোগ্য পরিবর্তনের পথ তৈরি হতে পারত।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















