ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। এ সময় প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রচারণা তুঙ্গে পৌঁছেছে এবং নির্বাচনী উত্তাপও ক্রমেই বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে প্রত্যন্ত জেলা থেকে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, আদিবাসী, নারী ভোটার এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হুমকি ও ভয়ভীতি ছড়ানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় সহিংসতার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে নাগরিক সমাজে।
এই প্রেক্ষাপটে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে নাগরিক সমাজের উদ্যোগে বিভিন্ন নাগরিক, আদিবাসী ও নারী উন্নয়ন সংগঠন মানববন্ধনের আয়োজন করে। মানববন্ধনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। এতে বক্তব্য দেন খুশী কবির, জাকির হোসেন, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্মল রোজারিও, মনীন্দ্র কুমারনাথ, সুব্রত চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, দীপায়ন খীসা, অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, কাজল দেবনাথ, রাশেদা কে চৌধুরীসহ অনেকে। বক্তারা সবাই আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও নারীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।
নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে উদ্বেগ
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনী পরিবেশে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে তা শুধু সংখ্যালঘু, আদিবাসী বা নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রার্থীরাও একই উদ্বেগে রয়েছেন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটের পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ভোটাধিকার নিশ্চিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শঙ্কামুক্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়া সাংবিধানিক অধিকার, তাই সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
খুশী কবির বলেন, সরকারের কাজ কোনো গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারণা চালানো নয়। বরং নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্র ও নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব।
নাগরিক সমাজের দাবি ও সুপারিশ
মানববন্ধনে শামসুল হুদা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নারী, আদিবাসী, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য প্রান্তিক ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল আরও সক্রিয় করতে হবে এবং জেলা পর্যায়েও একই ধরনের সেল কার্যকর করতে হবে। মাঠপর্যায়ের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রান্তিক ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ দিতে হবে। কোনো প্রশাসনিক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বিশেষ কোনো দলের পক্ষে কাজ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে হবে।
এছাড়া সব বয়স, ধর্ম, বর্ণ ও পেশার মানুষ—বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ভোটারদের নিরাপদে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভোটাধিকার মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সর্বাত্মক উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করা হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও সংখ্যালঘু, আদিবাসী, দলিত ও প্রান্তিক নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, বাড়িঘর বা সম্পদের ক্ষতি রোধে আগাম নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা আরও বলেন, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে বড় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজ—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের বিকল্প নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 










