চার দশক ধরে জন গ্রিশামের জীবনে একটি অভ্যাস অটুট রয়েছে। প্রতিদিন সকাল সাতটায় তিনি ভার্জিনিয়ার খামারবাড়ির অফিসে যান, একই ব্র্যান্ডের কফি পান করেন এবং সকাল এগারোটা পর্যন্ত টানা লেখেন—সপ্তাহে পাঁচ দিন। তরুণ আইনজীবী থাকাকালেই তিনি এই রুটিন শুরু করেছিলেন, যখন মূল কাজের দিন শুরুর আগে লিখতেন। এখন ৭০ বছর বয়সেও সকালে তিনি সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ সময় খুঁজে পান।
এই অবিচল রুটিনই গড়ে তুলেছে এক বিশাল সাহিত্য সাম্রাজ্য। তাঁর বই বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ কোটি কপি বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁর এজেন্ট। ১৯৯১ সালের আলোড়ন তোলা দ্য ফার্ম, দ্য পেলিকান ব্রিফ, দ্য রেইনমেকারসহ মোট ৫২টি বই—শিশুতোষ সিরিজসহ—সবকটিই বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষে উঠেছে।
নতুন উপন্যাস ও বিক্রির সাফল্য
গ্রিশামের সাম্প্রতিক উপন্যাস দ্য উইডো একটি রহস্যকাহিনি, যেখানে ছোট শহরের আইনজীবী সাইমন ল্যাচ—নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও জুয়ার আসক্ত—এক ধনী নারী হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। বইটি অক্টোবরে প্রকাশের পর থেকেই নিউ ইয়র্ক টাইমসের হার্ডকভার কথাসাহিত্য বেস্টসেলার তালিকায় রয়েছে। প্রকাশক ডাবলডে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে সব সংস্করণ মিলিয়ে ইতোমধ্যে এক মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে।
তবে কয়েক বছর আগে মনে হচ্ছিল তাঁর সাফল্যের জাদু ফুরিয়ে যেতে পারে। ২০২৩ সালের উপন্যাস দ্য এক্সচেঞ্জ: আফটার দ্য ফার্ম ব্যাপক সাফল্যের প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, কারণ এতে ফিরে আসে দ্য ফার্ম-এর জনপ্রিয় চরিত্র মিচ ম্যাকডিয়ার। কিন্তু বইটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। অক্টোবর থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত এর মুদ্রিত কপি বিক্রি হয় প্রায় পাঁচ লাখ ত্রিশ হাজার, যা আগের থ্রিলারের তুলনায় প্রায় এক লাখ কম।
গ্রিশাম বলেন, শীর্ষে ওঠা যেমন কঠিন, সেখানে টিকে থাকাও ততটাই কঠিন। তিনি প্রায় শেষ করেছেন তাঁর পরবর্তী উপন্যাস, যা আগামী অক্টোবরে প্রকাশিত হবে। বিষয় ও নাম এখনো গোপন রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের শরতে দ্য উইডো-এর চরিত্র সাইমন ল্যাচকে নিয়ে আরেকটি উপন্যাস প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে। লেখকের ভাষায়, পাঠকের সহানুভূতি জাগাতে না চাইলেও চরিত্রটিকে তিনি এতটাই ভালোবেসেছেন যে তাকে ফিরে আসতেই হচ্ছে—নিজেকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ নিয়ে।
বইয়ের বাজারের বদলে যাওয়া বাস্তবতা

১৯৮৯ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস এ টাইম টু কিল প্রকাশের সময় বইয়ের ব্যবসার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—তখনো অ্যামাজনের জন্ম হয়নি। গ্রিশাম আইনি থ্রিলার ধারাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান এবং নিয়মিত নতুন বই প্রকাশের সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করেন। বইয়ের দোকানগুলো তাঁর ধারাবাহিক প্রকাশনাকে নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস হিসেবে দেখত।
তিনি স্মরণ করেন, একসময় প্রতিটি শপিং মলে দুটি বড় বইয়ের দোকান থাকত এবং নতুন জনপ্রিয় লেখকের বই এলে সামনের সারিতে স্তূপ করে রাখা হতো—মিষ্টির মতো বিক্রি হতো সেগুলো। এখন তাঁর মতে, সংস্কৃতিগতভাবে মানুষের পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।
২০২৫ সালে মুদ্রিত বই বিক্রি হয়েছে মোট ৭৭ কোটি ৮৪ লাখ কপি, যা আগের বছরের সমান। তবে গত এক দশকে সামগ্রিক প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী বলেও জানা গেছে।
পাঠকের কাছে গ্রিশামের আকর্ষণ
গ্রিশাম এখনো সেই ধরনের আমেরিকান পাঠকের প্রতিনিধিত্ব করেন, যারা ছোট শহরের নীতিবান আইনজীবীর গল্পে সান্ত্বনা খোঁজেন—যেখানে বিপদকে জয় করে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভার্জিনিয়ার অবসরপ্রাপ্ত ফেডারেল আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তা রিচার্ড ল্যাম্ব দ্য উইডো পড়ে আনন্দ পেলেও কিছু কাহিনিগত ফাঁক লক্ষ্য করেছেন। তাঁর মতে, হয়তো এটাই কল্পকাহিনিকে আকর্ষণীয় করে তোলে—বাস্তবতা আর কল্পনার মিশ্রণ।

শুরুটা ছিল ব্যর্থতা দিয়ে
চল্লিশ বছর আগে গ্রিশাম ছিলেন মিসিসিপির একজন আইনজীবী ও রাজ্য আইনপ্রণেতা। বর্ণবিদ্বেষঘেরা এক হত্যামামলার গল্প নিয়ে উপন্যাস লেখার ভাবনা থেকেই যাত্রা শুরু। তখন তাঁর ধারণা ছিল—একটি উপন্যাস লিখে বিক্রি করতে পারলে সেটি সুন্দর একটি শখ হতে পারে।
কিন্তু এ টাইম টু কিল প্রকাশের পর প্রায় কেউই বইটির দিকে নজর দেয়নি। লেখকের ভাষায়, সেটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যর্থতা।
পরবর্তীতে তাঁর দ্বিতীয় বই দ্য ফার্ম কিনে নেন সম্পাদক ডেভিড গার্নার্ট, যিনি পরে তাঁর স্থায়ী এজেন্ট হয়ে যান এবং তখন থেকে সব কাজ সম্পাদনা করছেন। গার্নার্টের মতে, দ্য উইডো জনপ্রিয় হচ্ছে কারণ এটি প্রচলিত সহিংস থ্রিলারের চেয়ে অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক আবহ তৈরি করে—পাঠকেরা এখন এমন গল্পই খুঁজছেন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও প্রচারণা
দ্য উইডো-এর জুয়ার দৃশ্যগুলো লেখকের নিজের অভিজ্ঞতা থেকেও প্রভাবিত। বন্ধুদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত লাস ভেগাসে ব্ল্যাকজ্যাক খেলতে যেতেন। সম্প্রতি কলেজ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে ইন্ডিয়ানা হুসিয়ার্স জেতায় এক বন্ধুর কাছ থেকে স্কচের বোতলও জিতেছেন।
বই প্রকাশের আগে তাঁর প্রচারণা ছিল পুরোনো ও নতুন মাধ্যমের মিশ্রণ। বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং জনপ্রিয় পডকাস্টে অংশ নেন তিনি। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার বিষয়ে প্রকাশকের উৎসাহ থাকলেও গ্রিশাম এতে আগ্রহী নন। তাঁর মন্তব্য, ইন্টারনেটের আগের সময়েই তিনি দ্বিগুণ বেশি বই বিক্রি করেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















