আধুনিক আলোকচিত্রের পথিকৃৎ হিসেবে আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত আন্দ্রে কের্তেস একসময় নিজ প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ১৯৮৫ সালে ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করা এই শিল্পীর জীবন ও কাজ নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে প্যাট্রিসিয়া আলবার্সের লেখা জীবনীগ্রন্থে, যেখানে তাঁর ছবির নীরব গভীরতা ও ব্যক্তিজীবনের জটিলতা সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
অপ্রাপ্ত স্বীকৃতির দীর্ঘ ইতিহাস
মধ্যবয়সে পৌঁছে যাওয়ার পরও কের্তেসকে বড় শিল্পী হিসেবে দেখা হয়নি। একটি সাময়িকীতে তাঁর নাম প্রকাশিত হয়েছিল শিশুদের ছবি তোলার বিজ্ঞাপনের পাশে, অথচ একই সংখ্যায় তাঁরই শিষ্য ব্রাসাইয়ের জমকালো আলোকচিত্র প্রকাশ পায়। এই বৈপরীত্য তাঁর অপমানবোধকে তীব্র করে তোলে এবং দীর্ঘ জীবনজুড়ে স্বীকৃতিহীনতার অনুভূতি তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
ছবির ভেতরে আবেগের আবিষ্কার
প্যাট্রিসিয়া আলবার্স ষাটের দশকে প্রথম কের্তেসের ছবি দেখে মুগ্ধ হন। তাঁর কাছে এসব আলোকচিত্র ছিল আবেগে অনুরণিত এক নতুন অভিজ্ঞতা। বহু বছর পর লেখা এই জীবনীতে তিনি শুধু শিল্পীর জীবনই নয়, প্রতিটি ছবির সৌন্দর্য ও অন্তর্নিহিত অনুভূতিকে বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। কের্তেসের ব্যক্তিত্ব ছিল দ্বৈত—একদিকে কোমল ও অনুপ্রেরণাদায়ী, অন্যদিকে আড়ালে তীব্র সমালোচনামুখর। তবু তাঁর শিল্প সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে জীবনকে দেখেছে এক উন্মুক্ত সংলাপ হিসেবে।
যুদ্ধ, প্যারিস ও একক শিল্পভাষা
১৮৯৪ সালে বুদাপেস্টে জন্ম নেওয়া কের্তেস অল্প বয়সেই ক্যামেরার প্রতি আকৃষ্ট হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পূর্ব ফ্রন্টে সৈনিক হিসেবে থেকেও তিনি ছবি তোলা চালিয়ে যান। যুদ্ধশেষে সাধারণ চাকরিজীবন তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। বিশের দশকে প্যারিসে গিয়ে তিনি সুররিয়াল ধারার সংস্পর্শে এলেও শেষ পর্যন্ত গড়ে তোলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব ভঙ্গি—তত্ত্বহীন, প্রবৃত্তিনির্ভর, তির্যক কোণ ও অপ্রত্যাশিত দৃশ্যের কবিতাময় ব্যবহার।
নিউইয়র্কে সংগ্রাম ও ধীর স্বীকৃতি
১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়ে তিনি বাণিজ্যিক কাজ করেন এবং দীর্ঘদিন একটি গৃহসজ্জাবিষয়ক সাময়িকীর সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তবু তাঁর নীরব, বিষণ্ন সংবেদনশীলতা আমেরিকান প্রদর্শনমুখী রুচির সঙ্গে মেলেনি। সম্পাদকদের কেউ কেউ তাঁর ছবি বুঝতেই পারেননি। তবু তিনি থেমে থাকেননি; বয়স ও শারীরিক দুর্বলতা বাড়লেও জানালা কিংবা বারান্দা থেকেই ছবি তুলে গেছেন ধৈর্যের সঙ্গে, যেন মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকা এক জেলে।
মানুষ ও শিল্পীর ভিন্নতা
ব্যক্তিজীবনে তিনি অস্থির ও কঠোর হতে পারতেন, কিন্তু তাঁর শিল্প ছিল উন্মুক্ত হৃদয়ের প্রকাশ। এক ছবিতে গির্জার মিনার, দূরে কুয়াশায় ঢাকা যমজ অট্টালিকা এবং আকাশে উড়ে যাওয়া পাখির ছায়া—সময়ের, বিশ্বাসের ও স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে। পাখি ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়; সেগুলো তাঁর কাছে মানবআত্মা ও সৃষ্টিশীল স্বাধীনতার প্রতিরূপ। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি বলেছিলেন, তিনি আর পাখির গান শুনতে পান না—যেন ব্যক্তিগত শোক তাঁর শিল্পীসত্তার গভীরতাকেই স্পর্শ করেছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















