আধুনিক স্থাপত্যের ইতিহাসে ব্রুস গফ এমন এক নাম, যিনি দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও সৃজনশীলতার অনন্য উদাহরণ রেখে গেছেন। শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে আয়োজিত নতুন প্রদর্শনী তাঁর কাজ ও ভাবনার জগৎকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। সাম্প্রতিক সময়ের স্থাপত্যভিত্তিক কোনো প্রদর্শনী এতটা আনন্দ ও আশাবাদ জাগায়নি বলেই মনে করছেন সমালোচকেরা।
অজানা প্রতিভার উত্থান
১৯০৪ সালে কানসাসে দারিদ্র্যের মধ্যে জন্ম নেওয়া ব্রুস গফ ছিলেন মধ্য বিংশ শতকের এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। তিনি যেমন ছিলেন প্রডিজি, তেমনি বহু বিদ্যায় পারদর্শী। ভিয়েনার চিত্রকলার ধারা, জনপ্রিয় টেলিভিশন কল্পকাহিনি, পুয়েবলো মৃৎশিল্প, ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইটের নকশা কিংবা রাস্তার পাশের ডাইনার—সবকিছু থেকেই তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। তাঁর নির্মাণে ইট-পাথরের পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়েছে তেলের পাইপ, সেলোফেন, ময়ূরের পালক কিংবা ঝিনুকের মতো অপ্রচলিত উপকরণ। এমনকি তাঁর একটি বিখ্যাত বাড়ি তৈরি হয়েছিল কোয়ানসেট হাটের ধাতব কাঠামো দিয়ে।
স্বীকৃতি ও বিতর্ক
ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইট ও লুই সুলিভান ছিলেন তাঁর প্রাথমিক প্রেরণা। উচ্চ আধুনিকতার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ফিলিপ জনসন তাঁর প্রতি সংশয় প্রকাশ করলেও প্রতিভা স্বীকার করেছিলেন। টাইম, লাইফ ও ভোগ সাময়িকীতে তাঁকে নিয়ে লেখা প্রকাশিত হয়। তবু স্থাপত্যজগতের অভিজাত অংশে তিনি ছিলেন এক ধরনের ‘অভ্যন্তরীণ বহিরাগত’।
সমালোচকেরা মনে করেন, গফের অনেক কাজই জৈবিক জ্যামিতি, কাব্যিকতা ও আনন্দের মিশ্রণে গড়া। ১৯৭০ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের সমালোচক এডা লুইস হাক্সটেবল তাঁর কাজকে আমেরিকান স্থাপত্য প্রতিভার সবচেয়ে প্ররোচনামূলক প্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
শিকাগো প্রদর্শনীর তাৎপর্য
“ব্রুস গফ: ম্যাটেরিয়াল ওয়ার্ল্ডস” শিরোনামের এই প্রদর্শনী গফের সৃজনজগতের গভীরে প্রবেশের বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। শৈশবের আঁকাজোকা থেকে শুরু করে যুদ্ধোত্তর সময়ের কাজ—সবকিছুই এতে স্থান পেয়েছে। নৌবাহিনীতে কাজ শেষে তিনি ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ পরিচালনা করেন এবং সৃজনশীল চিন্তার কেন্দ্র গড়ে তোলেন। কিন্তু ম্যাকার্থি আমলের সমকামীবিরোধী প্রচারণার চাপে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়।

পরবর্তীতে তিনি প্রাইস টাওয়ারে নিজের কাজ চালিয়ে যান। প্রদর্শনীতে তাঁর নকশা করা শিন’এন কান প্রাসাদের দলিল, অঙ্কন, আসবাব ও ছবি রয়েছে—যা নব্বইয়ের দশকে অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়ে যায়। মোট প্রায় দুই শতাধিক অঙ্কন, চিত্রকর্ম ও বস্তু এতে প্রদর্শিত হচ্ছে। তাঁর নকশায় ব্যবহৃত পুনর্ব্যবহৃত কাচ, নকশাদার কার্পেট কিংবা নিজস্ব পোশাক—সবই তাঁর সৃজনী বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে।
জনপ্রিয় আধুনিকতার রূপকার
আধুনিক স্থাপত্যকে ঘিরে সমালোচনা থাকলেও গফ ছিলেন একাধারে আধুনিকতাবাদী ও জনমুখী স্রষ্টা। কিশোর বয়সেই তিনি টালসায় আর্ট ডেকো ও নিও-গথিক শৈলীর একটি গির্জা নকশায় যুক্ত ছিলেন। লাস ভেগাসের জন্য তাঁর পরিকল্পিত হোটেল-ক্যাসিনো নির্মিত না হলেও ধারণাগত দিক থেকে তা ছিল সময়ের আগের চিন্তা।
মানুষের জন্য স্থাপত্য
গফের স্থাপত্য ছিল আশাবাদী আমেরিকান অভিজ্ঞতার এক ভালোবাসার চিঠি। তাঁর গ্রাহকদের মধ্যে ছিলেন জুতার বিক্রেতা, তেলশ্রমিক, ব্যাংকার, কৃষক, ভাস্কর কিংবা দন্তচিকিৎসক। বাজেট কম হলে তিনি সস্তা উপকরণ দিয়েই সৃজনশীল সমাধান বের করতেন এবং মানুষকে নিজস্ব বাড়ি নির্মাণে উৎসাহ দিতেন।
বিখ্যাত বেভিঞ্জার হাউস ছিল সর্পিল নকশার এক কল্পনাময় স্থাপনা, যার ভেতর ঝুলন্ত কক্ষ, জলাধার ও উন্মুক্ত বসার জায়গা ছিল। আবার ইলিনয়ের ফোর্ড পরিবারের জন্য তিনি সামরিক কোয়ানসেট কাঠামো ব্যবহার করে গম্বুজাকৃতি ঘর তৈরি করেন, যা প্রতিবেশীদের বিস্মিত করেছিল।
শেষ জীবন ও উত্তরাধিকার
মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি প্রায় পাঁচ শত প্রকল্পে কাজ করেন, যার মধ্যে প্রায় একশ ত্রিশটি বাস্তবায়িত হয়। জীবনের শেষ সময়ে টেক্সাসের এক সাধারণ ঘরে বসেই তিনি অঙ্কন ও চিঠিপত্র চালিয়ে যেতেন। প্রতিদিন বিকেলে কাজ থামিয়ে টেলিভিশনে স্টার ট্রেক দেখতেন—এমন স্মৃতিও তুলে ধরা হয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে স্থায়ী স্মারক
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি মিউজিয়াম অব আর্টের জন্য তাঁর নকশা করা জাপানি শিল্প প্যাভিলিয়ন আজ শহরের প্রতীক হয়ে উঠেছে। খাড়া ছাদ, স্বচ্ছ প্রাচীর, বাঁকানো বারান্দা ও জলধারার সমন্বয়ে এটি বিংশ শতকের আমেরিকান স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
ব্রুস গফের কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সৃজনশীলতা, উদারতা ও কল্পনাশক্তিই আধুনিকতার প্রকৃত শক্তি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















