কলেজে ভর্তির জটিল পথচলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে ঝুঁকছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। আবেদন প্রক্রিয়ার নানা ধাপ বুঝতে, সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠান খুঁজতে কিংবা ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা আন্দাজ করতে তারা ব্যবহার করছেন চ্যাটবটভিত্তিক প্রযুক্তি। তবে এই নির্ভরতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভুল তথ্য ও অবাস্তব প্রত্যাশার ঝুঁকি।
অভিভাবকের দুশ্চিন্তা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ভরসা
সেপ্টেম্বর মাসে এক অভিভাবক নিজের সন্তানের কলেজ আবেদন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন। ইতিহাস ও সংগীতে আগ্রহী তার সন্তান উচ্চবিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে পড়ছে, কিন্তু বর্তমান ভর্তি প্রক্রিয়া আগের তুলনায় এতটাই বদলে গেছে যে তিনি নিজেকে অসহায় মনে করেন। বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং না থাকায় তিনি সহায়তার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শরণাপন্ন হন।
প্রথমে তিনি সাধারণ কিছু প্রশ্ন করেন—মানক আবেদনপত্র কীভাবে পূরণ করতে হয় বা কার্যক্রমের তালিকা বলতে কী বোঝায়। এরপর সন্তানের ফলাফল অনুযায়ী উপযুক্ত ছোট লিবারেল আর্টস কলেজের পরামর্শ চান। এমনকি সন্তানের আবেদন করা ১৪টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিয়ে কোথায় ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তাও জানতে চান। তার ভাষায়, অনিশ্চিত প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি পেতেই এই উদ্যোগ।
শিক্ষার্থী-অভিভাবকের নতুন সহায়ক হিসেবে চ্যাটবট
কলেজে আবেদন প্রক্রিয়ার চাপ সামলাতে অনেকেই এখন চ্যাটবটকে একধরনের ভার্চুয়াল পরামর্শদাতা হিসেবে ব্যবহার করছেন। ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা যায়, প্রতি তিনজন উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীর একজন কলেজ পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ।
কিছু প্রতিষ্ঠান ভর্তি প্রবন্ধ লেখায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে সতর্ক করলেও ধারণা বিনিময় বা ভাবনা তৈরিতে ব্যবহার নিয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই। ফলে অনেক শিক্ষার্থী এটিকে অভিভাবক বা পরামর্শকের সহায়তার সমতুল্য মনে করছে। কেউ প্রকৌশলসমৃদ্ধ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা তৈরিতে, কেউ আবার শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা জানতে চ্যাটবট ব্যবহার করছে। আবার কেউ নিজের বার্তা ইতিহাস বিশ্লেষণ করে প্রবন্ধের বিষয় খুঁজতেও প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে।
সহজলভ্যতা বনাম ভুল তথ্যের আশঙ্কা
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে চ্যাটবট সবসময় প্রস্তুত, সান্ত্বনাদায়ক এবং ব্যয়বহুল ব্যক্তিগত পরামর্শকের তুলনায় অনেক সস্তা। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভুল তথ্য প্রদান ও ব্যবহারকারীর মনরক্ষা করার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতে পারে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবেদন সময়সীমা বা গড় ফলাফলের তথ্য খুঁজতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়ক হতে পারে, বিশেষত যেখানে কাউন্সেলরের অভাব রয়েছে। তবে নিজের উপযোগী প্রতিষ্ঠান নির্ধারণের মতো গভীর আত্মবিশ্লেষণ কোনো যন্ত্র করতে পারে না।
সমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা
সমর্থকদের যুক্তি, ব্যক্তিগত পরামর্শকের নাগাল না থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে, একজন স্কুল কাউন্সেলরের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। নিম্নআয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা খরচে কলেজ কোচিং দেওয়া একটি সংস্থাও ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহায়তা চালু করেছে, যাতে সাধারণ প্রশ্নের উত্তর প্রযুক্তি দিলেও জটিল পরামর্শ দেন মানব কাউন্সেলররা।
ভুল তথ্য ও কল্পিত বৃত্তির সমস্যা
কিছু শিক্ষার্থী জানিয়েছে, চ্যাটবট প্রায়ই বাস্তবসম্মত কিন্তু মিথ্যা তথ্য তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে এমন বৃত্তির কথা বলা হয়েছে, যার কোনো অস্তিত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে নেই। আবার কেউ প্রবন্ধের খসড়া লিখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিলেও অন্যরা কেবল ভাষা পরিষ্কার করার পরামর্শ নিয়েছে। কোন ব্যবহার অনুমোদিত আর কোনটি নয়—এ নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে, কারণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নীতি ভিন্ন।
ভর্তি সম্ভাবনা মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা
চূড়ান্ত বর্ষের উদ্বেগপূর্ণ সময়ে অনেক শিক্ষার্থী অনলাইনের বদলে চ্যাটবটকে জিজ্ঞেস করছে তাদের ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা কতটা। কিন্তু এসব পূর্বাভাস প্রায়ই অতিরিক্ত আশাবাদী। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ পেতে দীর্ঘ সময় লাগে, ফলে পুরোনো উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। অভিজ্ঞ ভর্তি কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণই এখানে বেশি নির্ভরযোগ্য।
সব মিলিয়ে কলেজে ভর্তির পথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন নতুন সহায়ক হিসেবে উঠে এসেছে, তেমনি সতর্কতার প্রয়োজনও বাড়িয়েছে। প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখনো মানবিক বিচারবোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















