বর্তমানে অনেকেই প্রতিদিন একাধিক সাপ্লিমেন্ট সেবন করছেন। সকাল-বিকেল মিলিয়ে কেউ কেউ ২০ ধরনেরও বেশি ভিটামিন ও পাউডার গ্রহণ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পডকাস্টের প্রভাবেই অনেকের এই প্রবণতা বেড়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এসব সাপ্লিমেন্ট কি সত্যিই দরকার, নাকি সুষম খাদ্য থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া সম্ভব?
সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজনীয়তা ও ঝুঁকি
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিদ ও গবেষক মারিলি ওপেজ্জো বলেন, নির্দিষ্ট পুষ্টির ঘাটতি থাকলে বা গর্ভাবস্থার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে সাপ্লিমেন্ট উপকারী হতে পারে। তবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক ডা. জোয়ান ম্যানসনের মতে, কিছু সাপ্লিমেন্টে অতিরিক্ত মাত্রার পুষ্টি উপাদান বা দূষিত উপাদান থাকতে পারে। এগুলো ওভার-দ্য-কাউন্টার বা প্রেসক্রিপশন ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুষম খাদ্য থেকে পুষ্টি গ্রহণই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর।
মাল্টিভিটামিন
অনেকে খাদ্যে ঘাটতি পূরণের নিরাপত্তা হিসেবে মাল্টিভিটামিন গ্রহণ করেন। তবে বয়স্ক ব্যক্তি, কঠোর ডায়েট অনুসরণকারী বা যাদের পুষ্টি শোষণে সমস্যা আছে, তাদের ছাড়া অধিকাংশ মানুষের জন্য এটি প্রয়োজন হয় না।
ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম, পূর্ণ শস্য, দুগ্ধজাত খাবার ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের সমন্বয়ে সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া সম্ভব। রঙিন ফল ও সবজি যত বেশি খাবেন, তত বেশি বৈচিত্র্যময় পুষ্টি মিলবে।

ম্যাগনেসিয়াম
অনেকে অনিদ্রা, মাইগ্রেন বা কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট নেন। কিছু ক্ষেত্রে উপকার মিললেও প্রথমে খাদ্য থেকেই তা নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিদিন ৩১০ থেকে ৪২০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োজন। কুমড়োর বীজ, কাঠবাদাম, রান্না করা পালং শাক, কালো মটরশুঁটি ও কুইনোয়া ভালো উৎস হতে পারে।
প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক
অন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট জনপ্রিয়। তবে অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এগুলোর কার্যকারিতার পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই।
এর পরিবর্তে কিমচি, দই, কেফির, মিসোর মতো ফারমেন্টেড খাবার এবং আঁশসমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ খাদ্য গ্রহণ করলে অন্ত্রের উপকারী জীবাণু বৃদ্ধি পায়।
ফিশ অয়েল বা ওমেগা-৩
মাছ খেলে হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং ডিমেনশিয়া ও বিষণ্নতার ঝুঁকি কমে—এমন প্রমাণ রয়েছে। তবে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্টে একই সুবিধা সবসময় পাওয়া যায় না।
সপ্তাহে অন্তত দুইবার স্যামন, সার্ডিন, ম্যাকারেল বা ট্রাউটের মতো তেলযুক্ত মাছ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া তিসি বীজ, চিয়া বীজ ও আখরোটও ভালো উৎস।
ভিটামিন সি
অনেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন সি গ্রহণ করেন। যদিও শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এটি প্রয়োজনীয়, সাপ্লিমেন্টের অতিরিক্ত উপকারিতার প্রমাণ সীমিত।
একটি কমলা, দুটি কিউই, এক কাপ ব্রকলি বা অর্ধেক কাপ লাল ক্যাপসিকাম থেকেই দৈনিক প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
কোলাজেন
কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট ত্বকের বলিরেখা কমানো বা চুল-নখ মজবুত করার দাবি করে। তবে এ বিষয়ে প্রমাণ সীমিত।
পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন সি, তামা ও জিঙ্কসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ শরীরে স্বাভাবিক কোলাজেন উৎপাদন বাড়ায়। পাশাপাশি রোদ ও অ্যালকোহল কমানো, ধূমপান পরিহার, নিয়মিত ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত পানি পান গুরুত্বপূর্ণ।
ভিটামিন বি১২
বয়স্ক ব্যক্তি, নিরামিষভোজী, কিছু অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত বা নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে বি১২ সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।
তবে অধিকাংশ মানুষের জন্য মাছ, লাল মাংস, ডিম ও দুগ্ধজাত খাবার থেকেই দৈনিক ২.৪ মাইক্রোগ্রাম বি১২ সহজে পাওয়া যায়। অনেক সিরিয়াল ও উদ্ভিজ্জ দুধেও বি১২ যুক্ত থাকে।

প্রোটিন পাউডার
ওজন কমানো বা পেশি বাড়ানোর জন্য অনেকে প্রোটিন পাউডার গ্রহণ করেন। কিন্তু সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে অধিকাংশ মানুষের আলাদা প্রোটিন পাউডারের প্রয়োজন হয় না।
গ্রিক দই, ডিম, ডাল, মাছ বা চর্বিহীন মাংস নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হয়।
আঁশ বা ফাইবার
অনেকেই পর্যাপ্ত আঁশ গ্রহণ করেন না। তবে ডাল, বাদাম, পূর্ণ শস্য, ফল ও শাকসবজি থেকে আঁশ পাওয়াই উত্তম। এতে ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টিও মেলে।
খাদ্য থেকে পর্যাপ্ত আঁশ না পেলে সাইলিয়ামজাত দ্রবণীয় আঁশ সাপ্লিমেন্ট কোষ্ঠকাঠিন্য ও অন্যান্য হজম সমস্যায় সহায়ক হতে পারে।
গ্রিনস পাউডার
গ্রিনস পাউডারে নানা ফল, সবজি ও ভেষজের গুঁড়া থাকে এবং অনেক সময় অতিরিক্ত ভিটামিন যুক্ত থাকে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো মূলত উন্নত মানের মাল্টিভিটামিন ছাড়া কিছু নয়।
তাজা বা হিমায়িত ফল ও সবজি কেনাই বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। প্রকৃত খাবারই শরীরের জন্য সবচেয়ে উপকারী।
বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া অধিকাংশ মানুষের জন্য সাপ্লিমেন্ট অপরিহার্য নয়। সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য গ্রহণই সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করাই নিরাপদ পন্থা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















