বিশ্বজুড়ে জেট ইঞ্জিন মেরামতের দীর্ঘসূত্রতা ও যন্ত্রাংশের সংকট কাটাতে নতুন কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিমান ইঞ্জিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান GE Aerospace। প্রতিষ্ঠানটি সিঙ্গাপুরে তাদের বড় মেরামত কেন্দ্রে রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ‘লিন’ উৎপাদন পদ্ধতি চালু করে কাজের গতি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন নতুন প্রজন্মের জেট ইঞ্জিনে অপ্রত্যাশিত ক্ষয় ও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বহু উড়োজাহাজ দীর্ঘদিন মাটিতে পড়ে আছে। ফলে পুরোনো বিমানগুলোকে বেশি দিন চালাতে হচ্ছে, আর ইঞ্জিন মেরামতের লাইনে অপেক্ষার সময় কয়েক মাস পর্যন্ত গড়াচ্ছে।
শিল্পখাতে চাপ ও দ্বন্দ্ব
বর্তমান সংকটকে কেন্দ্র করে বিমান সংস্থা ও ইঞ্জিন নির্মাতাদের মধ্যে প্রকাশ্য অসন্তোষও দেখা দিয়েছে। কয়েকটি এয়ারলাইন অভিযোগ করেছে, যন্ত্রাংশের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে নির্মাতারা দাম বাড়াচ্ছে। তবে নির্মাতাদের দাবি, নতুন ইঞ্জিন উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগের পর তারা এখন মেরামত ও সহায়তা অবকাঠামো বাড়াতে বড় অঙ্কের অর্থ ঢালছে।
মালয়েশিয়ার স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইন AirAsia-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা Tony Fernandes বলেন, ইঞ্জিন নির্মাতাদের মনে রাখতে হবে এয়ারলাইনগুলোই তাদের ভবিষ্যৎ অংশীদার।
চাপ সামলাতে সিঙ্গাপুর কেন্দ্র
জিই অ্যারোস্পেস জানিয়েছে, সিঙ্গাপুর তাদের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় দুই হাজার কর্মী নিয়ে পরিচালিত এই মেরামত কেন্দ্র আধুনিকায়নে সর্বোচ্চ ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য হলো কারখানার আয়তন না বাড়িয়ে কাজের বিন্যাস পুনর্গঠন, মেঝের জায়গা দক্ষভাবে ব্যবহার এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মেরামতের পরিমাণ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো।
প্রতিষ্ঠানটি তাদের ‘ফ্লাইট ডেক’ নামে পরিচিত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করছে, যা জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের উদ্ভাবিত ধারাবাহিক উন্নয়নভিত্তিক ‘লিন’ মডেল থেকে অনুপ্রাণিত। জিই-এর প্রধান নির্বাহী Larry Culp বলেন, লক্ষ্য কেবল ত্রৈমাসিক ফল ভালো দেখানো নয়, বরং প্রতিটি দিন ও প্রতিটি ঘণ্টাকে ফলপ্রসূ করা।
পুরোনো যন্ত্রাংশ মেরামতেই জোর
জিই ও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী Pratt & Whitney একই সঙ্গে নতুন বিমানের জন্য ইঞ্জিন সরবরাহ এবং বিদ্যমান বহর সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ নিরাপদভাবে মেরামত করে পুনরায় ব্যবহার করা গেলে নতুন যন্ত্রাংশের চাহিদা কমে এবং সরবরাহের চাপও হালকা হয়। জিই বলছে, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে মেরামতের মাধ্যমে সময় ও খরচ উভয়ই অর্ধেকে নামানো সম্ভব।

দ্রুত মেরামত, কম জায়গায় বেশি কাজ
সিঙ্গাপুর কারখানায় বহুল ব্যবহৃত CFM56 ইঞ্জিনের টারবাইন নজল মেরামতের বিভাগ পুনর্গঠন করা হয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে একটি মেরামতে গড়ে ৪০ দিন লাগত, সেখানে ২০২৮ সালের মধ্যে তা ২১ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ চাহিদা মাথায় রেখে নতুন প্রজন্মের LEAP ইঞ্জিনের মেরামত সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রস্তুতিও চলছে। অনুমোদিত মেরামত ব্যবস্থা না থাকলে এয়ারলাইনগুলোকে নতুন যন্ত্রাংশ কিনতে হয়, যা ব্যয়বহুল এবং সীমিত সরবরাহের কারণে সহজলভ্য নয়।
রোবটকে শেখানো হচ্ছে মানব স্পর্শ
সবচেয়ে জটিল কাজগুলোর একটি হলো কম্প্রেসর ব্লেডের সূক্ষ্ম ঘষামাজা বা ‘ব্লেন্ডিং’। এতদিন এই কাজ পুরোপুরি দক্ষ কারিগরের হাতে নির্ভরশীল ছিল। বছরের পর বছর অভিজ্ঞতায় অর্জিত চোখের মাপ ও স্পর্শের সূক্ষ্মতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এখন জিই চেষ্টা করছে সেই দক্ষতাকে রোবটের মাধ্যমে পুনরাবৃত্তিযোগ্য প্রক্রিয়ায় রূপ দিতে। লক্ষ্য হলো দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি কমানো এবং কম খরচে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি মেরামত প্রক্রিয়া কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। তাছাড়া নতুন বিমান উৎপাদন ধীরে চলার কারণে যে পুরোনো বিমানের চাহিদা বেড়েছিল, তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরছে। ফলে মেরামতের চাহিদাও ভবিষ্যতে ভারসাম্যে আসতে পারে।
তারপরও শিল্প সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, যন্ত্রাংশ সরবরাহ সংকট দ্রুত দূর হবে না। জিই প্রধান নির্বাহীর ভাষায়, এখন সময় অগ্নিনির্বাপণমূলক কাজ থেকে সরে এসে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল কর্মক্ষমতার দিকে এগোনোর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















