ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ান একটি চূড়ান্ত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে সই করেছে। এই চুক্তির আওতায় তাইওয়ান থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখবে। একই সঙ্গে তাইওয়ান প্রায় সব মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক বাতিল বা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চুক্তির মূল বিষয়বস্তু
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর থেকে প্রকাশিত নথিতে জানানো হয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে তাইওয়ান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মার্কিন পণ্য আমদানি বাড়াবে। চার বছরে প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার অঙ্গীকার করেছে দেশটি।
এর মধ্যে রয়েছে ৪৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত তেল, ১৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বেসামরিক উড়োজাহাজ ও ইঞ্জিন এবং ২৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুৎ গ্রিড সরঞ্জাম, জেনারেটর, সামুদ্রিক ও ইস্পাত উৎপাদন যন্ত্রপাতি।

আগের কাঠামোগত চুক্তির সম্প্রসারণ
জানুয়ারিতে যে প্রাথমিক কাঠামোগত চুক্তি হয়েছিল, এই চূড়ান্ত নথি তাতে কারিগরি ভাষা ও বিস্তারিত শর্ত যুক্ত করেছে। শুরুতে তাইওয়ানের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও তা কমিয়ে ১৫ শতাংশে আনা হয়। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে তাইওয়ান সমান অবস্থানে এসেছে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এই চুক্তিকে দেশের অর্থনীতি ও শিল্পখাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাঠামো আরও সুসংহত হবে, নির্ভরযোগ্য শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে উঠবে এবং উচ্চপ্রযুক্তি খাতে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার হবে।
শুল্ক ছাড় ও সংসদীয় অনুমোদন
তাইওয়ান দুই হাজারের বেশি পণ্যের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শুল্ক থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। এর ফলে মার্কিন রপ্তানির ওপর গড় শুল্ক কমে ১২ দশমিক ৩৩ শতাংশে নেমে আসবে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এই চুক্তি কার্যকর হতে হলে তাইওয়ানের পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। বর্তমানে সেখানে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।

বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি ও উচ্চপ্রযুক্তি খাত
জানুয়ারির সমঝোতায় তাইওয়ান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাদের কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ২৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এর মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যে প্রতিশ্রুত হয়েছে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির পক্ষ থেকে। পাশাপাশি তাইওয়ান সরকার আরও ২৫০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বিনিয়োগে গ্যারান্টি দেবে বলে জানানো হয়েছিল।
চূড়ান্ত নথিতে এসব বিনিয়োগের বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলেও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে তাইওয়ানের প্রতিনিধিত্বকারী দপ্তর উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদন খাতে নতুন কারখানা স্থাপন ও সম্প্রসারণে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত ইলেকট্রনিক্স খাতে সহযোগিতা জোরদার হবে।
কৃষি ও গাড়ি খাতে পরিবর্তন
চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কৃষিপণ্যের ওপর তাইওয়ানের সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার হবে। এর মধ্যে গরুর মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও ভুট্টা রয়েছে। তবে কিছু পণ্যে শুল্ক আংশিক কমবে। যেমন শূকরের পেটির মাংসে বর্তমানে ৪০ শতাংশ শুল্ক ১০ শতাংশে নামবে এবং হ্যামে ৩২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামবে।
এছাড়া তাইওয়ান মোটরযানের ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা দূর করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ির নিরাপত্তা মান, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও ওষুধের মানদণ্ড গ্রহণ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই চুক্তি মার্কিন কৃষক, খামার মালিক, জেলে, শ্রমিক ও উৎপাদকদের জন্য রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও স্থিতিশীল ও সহনশীল করবে।

বাণিজ্য ঘাটতির প্রেক্ষাপট
মার্কিন পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১২৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৪ সালের পুরো বছরের ৭৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে অনেক বেশি। বিশেষ করে তাইওয়ান থেকে উচ্চমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ আমদানির বড় উল্লম্ফনের কারণেই এই ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই নতুন চুক্তি সেই ভারসাম্য আনার পাশাপাশি দুই দেশের কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার পথ তৈরি করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















