মাত্র ছয় বছর আগেও ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট শাসিত অঙ্গরাজ্যগুলোই শিক্ষায় এগিয়ে। পড়া ও গণিতের পরীক্ষায় তাদের শিক্ষার্থীদের ফল ছিল ভালো। কিন্তু মহামারির পর চিত্র বদলে গেছে। আলাবামা, ফ্লোরিডা, লুইজিয়ানা, মিসিসিপি ও টেক্সাসের মতো দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলো জাতীয় র্যাঙ্কিংয়ে দ্রুত উপরে উঠে এসেছে।
দারিদ্র্যসহ অন্যান্য সামাজিক সূচক সমন্বয় করে ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এই উত্থান আরও স্পষ্ট হয়। আরবান ইনস্টিটিউটের এক তালিকায় সবার ওপরে উঠে এসেছে মিসিসিপি। ফ্লোরিডা, টেক্সাস ও লুইজিয়ানাও এগিয়ে গেছে ম্যাসাচুসেটসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী রাজ্যের চেয়ে।
![]()
মৌলিক পদ্ধতিতে ফেরা এবং জবাবদিহি
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলো শিক্ষায় মৌলিক পদ্ধতিতে ফিরে গেছে। পাঠ শেখাতে ধ্বনিভিত্তিক পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, ব্যর্থ স্কুলগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব নীতিগত পরিবর্তন শ্রেণিকক্ষে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে তেরো হাজারের বেশি স্কুল জেলা রয়েছে, যাদের নিজস্ব নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা আছে। ফলে অনেক শহর ও জেলা ছোট ছোট পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিয়ে দেখছে কোন পদ্ধতি কাজ করে। আলাবামার বার্মিংহাম শহর তেমনই এক উদাহরণ।
বার্মিংহামের ঘুরে দাঁড়ানো
বার্মিংহামের স্কুল জেলায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী কৃষ্ণাঙ্গ এবং দশজনের নয়জনই বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যের খাবারের সুবিধাভোগী। দীর্ঘদিন তাদের ফল ছিল হতাশাজনক। কিন্তু কয়েকটি কৌশলী উদ্যোগে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।
গত দুই বছরে এফ গ্রেড পাওয়া স্কুলের সংখ্যা পনেরো থেকে নেমে এসেছে একটিতে। স্ট্যানফোর্ড ও হার্ভার্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, মহামারিকালে গণিতে যে শিক্ষাঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা বার্মিংহামের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে দ্রুত পূরণ করছে। আলাবামার গভর্নর কে আইভি পর্যন্ত ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের অঙ্গরাজ্য এখন শুধু ফুটবল নয়, শিক্ষার জন্যও পরিচিত।

অনুপস্থিতি রোধে লটারির কৌশল
মহামারির পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে স্কুলে অনুপস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। ২০২৩ সালে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত অনুপস্থিত ছিল। বার্মিংহামও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
শহর কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে, শিক্ষার্থীরা স্কুলে না এলে শেখা সম্ভব নয়। তাই তারা সরকারি আবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রণোদনা চালু করে। ‘এভরি ডে কাউন্টস’ কর্মসূচির আওতায় কোনো শিক্ষার্থী টানা এক মাস শতভাগ উপস্থিত থাকলে তার অভিভাবক লটারিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। বিজয়ী হলে শহর কর্তৃপক্ষ তার বাসাভাড়া বা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে।
এছাড়া অনুপস্থিতির কারণে কিশোরদের গ্রেপ্তার না করে তাদের পোশাক ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শহরে ৪৩৭ জন শিক্ষার্থী গৃহহীন। চার বছরে দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতির হার ২৯ শতাংশ থেকে কমে ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
ছুটির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অতিরিক্ত ক্লাস
যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা অনেক উন্নত দেশের তুলনায় কম দিন স্কুলে যায়। বার্মিংহামের শিক্ষা প্রধান মার্ক সুলিভান ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের প্রস্তাব দিলেও বছরজুড়ে স্কুল চালুর ধারণা জনপ্রিয় হয়নি।
তাই চালু করা হয় বিরতির মধ্যেও স্বেচ্ছাভিত্তিক অতিরিক্ত ক্লাস। বাস ও দুপুরের খাবার সুবিধা চালু রাখা হয়। ২০২১ সালের শরতে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে প্রথমে অংশ নেয় প্রায় ১৮০০ শিক্ষার্থী। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাত হাজার, আর গ্রীষ্মে দশ হাজারে পৌঁছায়, যা জেলার অর্ধেক শিক্ষার্থী।
স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দিয়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সহায়তা দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে তৃতীয় শ্রেণির মাত্র ৫৩ শতাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণি উপযোগী পাঠদক্ষতা অর্জন করেছিল। এখন তা বেড়ে ৮১ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণের হারও ৮২ থেকে বেড়ে সম্ভাব্য ৮৮ শতাংশে পৌঁছাতে যাচ্ছে।

কলেজে ভর্তিতে পূর্ণ সহায়তা
তরুণ মেয়র র্যান্ডাল উডফিন ‘বার্মিংহাম প্রমিস’ নামে একটি উদ্যোগ চালু করেছেন। এতে সরকারি স্কুলের স্নাতকদের জন্য আলাবামার বহু কলেজে পূর্ণ টিউশন ফি দেওয়া হয়। শহরের ১০ মিলিয়ন ডলারের তহবিলের সঙ্গে বেসরকারি খাত থেকে আরও ২০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের বোঝানো হয়েছে, এটি দান নয়, দক্ষ কর্মশক্তিতে বিনিয়োগ।
সব সাফল্য কি কৌশলের ফল
তবে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। টিউলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ডাগ হ্যারিস মনে করেন, শুধু ছোট উদ্যোগে এমন পরিবর্তন সম্ভব নয়। অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের বড় নীতিগত পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়া এক শহরের কৌশল অন্যত্র একইভাবে কাজ করবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়।
তারপরও আশাবাদীরা বলছেন, বড় প্রমাণভিত্তিক কর্মসূচির শুরু অনেক সময় ছোট শহরের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকেই হয়। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য আশা কম। কিন্তু বার্মিংহামের অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















