যুক্তরাষ্ট্রে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ফেডারেল সরকারের আইনি ক্ষমতার অবসান কার্যত স্পষ্ট হয়ে গেল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে দেশটিতে যাত্রীবাহী গাড়ি ও ট্রাক কতটা জ্বালানি সাশ্রয়ী হবে, তা বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণের মতো কার্যকর আইন আর থাকছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে যানবাহন খাতের দূষণ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হবে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বাড়তে পারে।
পরিবহন খাতই যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের সবচেয়ে বড় উৎস। এমন প্রেক্ষাপটে নিয়ম শিথিল হওয়ায় গাড়ি নির্মাতারা জনপ্রিয় কিন্তু বেশি জ্বালানি খরচকারী পিকআপ ও বড় আকারের গাড়ির দিকেই ঝুঁকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জলবায়ু নীতিতে বড় পরিবর্তন
ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক নিয়ম শিথিলের চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে বাতিল করা হয়েছে ‘এন্ডেঞ্জারমেন্ট ফাইন্ডিং’ নামে পরিচিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তটি। ২০০৯ সালে গৃহীত এই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, গ্রিনহাউস গ্যাস মানবস্বাস্থ্য ও জনকল্যাণের জন্য ক্ষতিকর। সেই ভিত্তিতেই পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা গাড়িসহ বিভিন্ন খাতে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করত।
সাবেক শীর্ষ নিয়ন্ত্রক মার্গো টি ওগে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এখন অর্থবহ কোনো নির্গমন মানদণ্ড কার্যত নেই। তাঁর ভাষায়, অনেক দেশেই এমন শূন্যতা নেই।

নিয়ম শিথিলের প্রভাব
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে আগামী ৩০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইতিমধ্যে তাপপ্রবাহ, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা বেড়েছে, হিমবাহ গলছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে।
পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার প্রশাসক লি জেলডিন এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিয়ম শিথিলের উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, আগের প্রশাসনের কড়া নিয়ম অটোমোবাইল শিল্পকে চাপে ফেলেছিল।
বাইডেন প্রশাসন বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বাড়াতে নির্গমন সীমা কঠোর করতে চেয়েছিল। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী ২০৩১ সালের মধ্যে গাড়ি নির্মাতাদের গড়ে প্রতি গ্যালনে ৩৪ দশমিক ৫ মাইল জ্বালানি দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের প্রায় ৫০ মাইলের লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম। কংগ্রেস লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানাও কার্যত শূন্যে নামিয়ে এনেছে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার শঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রে যদি বড় ও বেশি জ্বালানি খরচকারী গাড়ির আধিপত্য বাড়ে, তবে ইউরোপ ও চীনের বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে মার্কিন নির্মাতারা। চীন ইতিমধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়িতে দ্রুত এগোচ্ছে, এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্বও সেদিকেই সরে যেতে পারে।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোশুয়া লিন বলেন, বড় ট্রাক ও ক্রীড়া উপযোগী গাড়ি নির্মাতাদের বেশি মুনাফা দিলেও ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়ায় টিকে থাকতে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন অপরিহার্য।
![]()
অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য কঠোর মানদণ্ড বজায় রাখতে আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্য যুক্ত হতে পারে। এতে দেশজুড়ে ভিন্ন ভিন্ন নিয়মের জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরও কঠিন করবে।
মূল প্রশ্ন এখন, যুক্তরাষ্ট্র কি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু নীতির মূল স্রোত থেকে আলাদা পথে হাঁটবে, নাকি আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আবারও কঠোর মানদণ্ডে ফিরবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















