মার্টিন লুথার কিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে রক্তাক্ত কন্ঠে কণ্ঠী জেসি জ্যাকসন আজ আর নেই। ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি ৮৪ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন এমন একজন যিনি অসাধারণ ঐক্য ও মহানুভবতার বার্তা নিয়ে সমতা ও মানবাধিকারের লড়াইকে সামনে ধরে রেখেছিলেন। সারাক্ষণ রিপোর্টে থাকল তাঁর জীবনের সংগ্রাম ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবের গল্প।
প্রাণঘাতী ক্রন্দন থেকে নোবেলসহ সর্বঘটনার শিখরে
১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল মেমফিসে মার্টিন লুথার কিংকে হত্যার ঠিক পরের দৃশ্য হয়েছিলেন জ্যাকসন। তিনি দৌড়ে মটেলের বারান্দায় উঠে কিংয়ের রক্তাক্ত শরীরকে নিজের বস্ত্রভাগে নিয়ে আফসোস ও আক্রোশে ঘোষণা করেন যে তিনি ছিলেন ন্যায়ের পথের যাজক, ঘৃণার কুপথে নিহত এক মহান প্রেমিক। সেই দিন থেকেই তাঁর মনোবল দৃঢ় হয় দেশের সর্বশেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞায়।

রাষ্ট্রপতি পদে দুইবারের ইতিহাস
জ্যাকসন ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ নির্বাচনে রাষ্ট্রপতির আসনে প্রার্থী হয়ে ইতিহাস গড়ে প্রথম আফ্রিকান‑আমেরিকান হিসেবে বড় রাজনৈতিক দলের টিকিটে দৌড়েছিলেন। তাঁর প্রোগ্রাম ছিল সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত ছিল — ধনী থেকে বেশি কর নেওয়া, সামরিক ব্যয় কমিয়ে সমাজকল্যাণে ব্যয় বাড়ানো এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার ভূমিকা নেওয়া। তাঁর মহৎ স্বপ্ন ছিল এমন একটি আমেরিকা যেখানে শিক্ষা ও সুযোগে সঠিক সমতা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে সকল বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হবে।
ঐক্যের কোলাজ: “রেনবো কোলেশন” ও “পি ইউ এস এইচ”
জ্যাকসনের বড় লক্ষ্য ছিল মানুষকে বিভেদ থেকে বের করে সম্মিলিতভাবে কাজ করার পথ দেখানো। তিনি “ন্যাশনাল রেনবো কোলেশন” ও “পিপল ইউনাইটেড টু সেভ হিউম্যানিটি (পি ইউ এস এইচ)” গড়ে তুলে একটি সমন্বিত সমাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যেখানে সকল বর্ণ, পেশা ও পটভূমির মানুষ একসাথে মানবকল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করবে। তিনি শিশুদের অনুপ্রাণিত করতেন “আমি একজন” স্লোগানে এবং বড়দের বলতেন “আশা ধরে রাখো” — বিশ্বাস ছিল সময় আসবে, মানবাধিকার সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
অন্যদের পথে নয়, নিজের পথেই পথিক
জ্যাকসন মনে করতেন তিনি শুধু নেতা ছিলেন না, বরং তিনি সেই পথিক যিনি নৈতিক ও মূল্যবোধগত শক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি রাজনীতির বাইরে থেকেও মানুষের জীবনমান বদলাতে কাজ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আক্রোশ ভোটে রূপান্তরিত করা উচিত এবং সবার হৃদয়ে সহানুভূতি, মানবিকতা ও সমতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
এক যুগান্তকারী উত্তরাধিকার
২০০৮ সালের নির্বাচনে যখন প্রথম আফ্রিকান‑আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন জ্যাকসন আবেগে ভেসে ওঠেন। তিনি কষ্টে বলেন কিং এনে না দেখে গেছেন এই শুভ দিনটি। তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম, অনুপ্রেরণা ও দৃঢ় বিশ্বাসই এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে রয়ে গেলো।
জেসি জ্যাকসনের মৃত্যু হলেও তাঁর স্বপ্ন ও দর্শন আজও মানুষের মনে জ্বলছে। তিনি নিজেকে কখনো পরাজিত ভাবেননি, বরং মানুষের মুক্তির জন্য জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে লড়াই করে গেছেন। মানবিকতার সেই দীপ্ত আলো জ্বলতে থাকবে যুগের পর যুগ ধরে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















